খাসোগি হত্যা ।। সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত ১৫

মানবখবর ডেস্ক : সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যাকান্ডের ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষ শুক্রবার স্বীকারোক্তি দিয়েছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এর এক দিন না যেতেই আবার ‘নতুন তথ্য’ দিলেন দেশটির এক শীর্ষ কর্মকর্তা। ১৫ কর্মকর্তাকে সৌদি আরব থেকে ইস্তাম্বুলে পাঠানো, খাসোগিকে কনস্যুলেটের ভেতরে ভয়ভীতি দেখানো, অপহরণ করা হয় এবং শেষে প্রতিরোধের মুখে টুকরো টুকরো করে কাটার বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্স নতুন তথ্য দিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।

সৌদি কর্মকর্তা বলেন, কনস্যুলেটের মধ্যেই খাসোগিকে হত্যা করা হয় এবং হত্যার পর খাসোগির পোশাক পরে এক কর্মকর্তা কনস্যুলেট থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। জামাল খাসোগি কনস্যুলেট থেকে বেরিয়ে গেছেন এটা প্রমাণ করতেই এ কৌশল নেয়া হয়। তিনি জানান, রাজপরিবারের সাবেক এই উপদেষ্টাকে রিয়াদে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিল সরকার। এজন্য ১৫ সদস্যের একটি দলকে ইস্তাম্বুলে পাঠানো হয়।

সৌদির জেনারেল ইন্টেলিজেন্স প্রেসিডেন্সির উপ-প্রধান আহমেদ আসিরি এই ১৫ জনের দল গঠন করেন। তারা খাসোগির সঙ্গে সাক্ষাত করে তাকে বুঝিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। তাকে ফিরিয়ে আনতে শান্তিপূর্ণ উপায় অবলম্বনের স্থায়ী আদেশ জারি ছিল ওই ১৫ সদস্যের দলের প্রতি। তবে এই আদেশে অনুমতি ছাড়া যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ছিল। দলটির পরিকল্পনা ছিল, ইস্তাম্বুলের বাইরে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খাসোগিকে আটকে রাখার হবে। শেষ পর্যন্ত যদি ফিরতে না চান তাহলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে।

তিনি বলেন, এরকমই নির্দেশনা ছিল কিন্তু শুরুতেই সবকিছু ভুল পথে পরিচালিত হতে থাকে। এক পর্যায়ে এই কর্মকর্তারা আদেশ লঙ্ঘন করে দ্রুত সহিংস হয়ে উঠেন। তারা খাসোগিকে কনসাল জেনারেলের কার্যালয়ে নেয়। যেখানে মাহের মুতরেব নামের এক কর্মকর্তার সঙ্গে তিনি তর্কবিতর্কে জড়িয়ে পড়েন।

খাসোগি মুতরেবকে বলেন, যদি তিনি এক ঘণ্টার মধ্যে কনস্যুলেট ভবন থেকে বের না হন, তাহলে তুরস্ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন বাইরে থাকা ওই নারী।

মুতরেব কূটনৈতিক নীতি-নৈতিকতা লঙ্ঘন করছেন উল্লেখ করে খাসোগি তাকে বলেন, আপনি আমার সঙ্গে কী করতে যাচ্ছেন। আপনি কী আমাকে অপহরণ করতে চান?

মুতরেব বলেন, হ্যাঁ। আমরা তোমাকে ড্রাগ প্রয়োগ করবো এবং তুলে নিয়ে যাবো। এরপর খাসোগি চিৎকার শুরু করলে তাকে শান্ত করতে মুখে কাপড় ঢুকিয়ে দেন। চিৎকার থামানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং শ্বাসরোধে মারা যান খাসোগি।

 

সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত ১৫ জন

সৌদি আরবের সাংবাদিক জামাল খাসোগির হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন ১৫ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে তুরস্কের গণমাধ্যম। তুর্কি কর্মকর্তাদের দাবি, সৌদি নাগরিকের সমন্বয়ে গঠিত ওই হিট স্কোয়াড মিস্টার খাসোগির আলোচিত অন্তর্ধানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। মিস্টার খাসোগি কনস্যুলেটে পৌঁছানোর ঘণ্টাখানেক আগেই সন্দেহভাজনদের বেশিরভাগ দু’টি ব্যক্তিগত উডড়োজাহাজে ইতাবুলে আসেন। বিমান দু’টির টেইল নম্বর ছিল এইজিএসকে – ১ এবং এইজিএসকে – ২। ওই একইদিন তাঁরা আবার ওই বিমানগুলোতেই সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ফিরে যান। তুর্কি কর্মকর্তাদের ধারণা, যারা ইস্তান্বুলে এসেছিলেন তাঁরা সবাই সৌদি নাগরিক এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তবে সৌদি আরব শুরুতে মিস্টার খাসোগির নিখোঁজের পেছনে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে তারা এটা জানায় যে কনস্যুলেটের ভেতর হাতাহাতির এক পর্যাযায়ে ওই সাংবাদিক মারা যান।

সন্দেহভাজনদের নাম ছবিসহ তালিকা:

১. ড. সালাহ মুহাম্মদ তুবাইজি: সাতচল্লিশ বছর বয়সী এই ব্যক্তি একজন ফরেনসিক প্যাথোলজিস্ট, যিনি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ বিষযয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। ২০১৫ সালে তিনি টানা তিন মাস অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ান ইন্সটিটিউট অব ফরেনসিক মেডিসিনে কাজ করেন। নিজস্ব টুইটার অ্যাকাউন্টে তাঁর পরিচয় দেয়া আছে ফরেনসিক মেডিসিনের অধ্যাপক এবং সৌদি সাইন্টিফিক কাউন্সিল অব ফরেনসিকের প্রধান হিসেবে। তাঁর এই টুইটার অ্যাকাউন্টটি সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত। ২০১৪ সালে লন্ডনের একটি আরবী ভাষার সংবাদপত্র “আশরাক আল-আওসাত”-এর খবরে জানা যায়, ড. তুবাইজি সে সময়সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালযয়ের জেনারেল ডিরেক্টরেট অব পাবলিক সিকিউরিটির ফরেনসিক সায়েন্স বিভাগের লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে দাযয়িত্ব পালন করতেন। তাঁর ছবিযুক্ত একটি সাক্ষাতকারে দেখা যায় যে তিনি সেই পদের উপযুক্ত ইউনিফর্ম পরে আছেন। সেই সাক্ষাতকারে তিনি নিজের নকশা করা একটি ভ্রাম্যমান পরীক্ষাগার নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁর ওই ল্যাবরেটরির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল সেখানে মাত্র সাত মিনিটের মাথায় প্যাথোলজিস্টরা লাশের ময়নাতদন্ত করতে পারেন। হজ পালন করতে এসে যখন হাজীরা মারা যান, তখন যেন দ্রুততম সময়ে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানা যায়, সে লক্ষ্যেই এই পরীক্ষাগারটি নকশা করেছিলেন তিনি। তুর্কি কর্মকর্তারা এটাও জানান যে রিয়াদ থেকে ইস্তান্বুলের আতাতুর্ক বিমানবন্দরে যাওয়ার সময় ডা. তুবাইজি একটি “বোন স” বা করাত বহন করছিলেন। তিনি বেলা সোয়া তিনটার দিকে রিয়াদ থেকে ইস্তান্বুলে পৌঁছান এবং সৌদি কনস্যুলেটের পাশেই মুভেনপিক হোটেলে অবস্থান করেন। পরে রাত ১১টার দিকে ব্যক্তিগত বিমানে দুবাই হয় রিয়াদের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
২. মাহের আবদুল আজিজ এম মুতারেব: ৪৭ বছর বয়সী এই ব্যক্তি লন্ডনের সৌদি দূতাবাসে দুই বছর ধরে কাজ করেছেন বলে জানা গেছে।
২০০৭ সালে ব্রিটিশ সরকারের প্রকাশিত এক নথি থেকে জানা যায়, এই নামের একজন ফার্স্ট সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করতেন।
তিনি একজন ইন্টেলিজেন্স সিকিউরিটি অপারেটিভ বলে বিবিসিকে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সেই সূত্র ২০১১ সালে মিস্টার মুতারেবের সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং তিনি তাকে সৌদি আরবের হয়ে স্পাইওয়্যার প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে ছিলেন বলেও জানা যায়। সেই প্রশিক্ষক মুতারেবকে “অন্ধকার মুখো” বলে ডাকতেন, কেননা তিনি সবসময় বিরস মুখে খুব চুপচাপ থাকতেন। লন্ডনে একটি সৌদি সূত্রের বরাতে সিএনএন জানায়, মুতারেবের পরিচিতরা তাকে সৌদি গোয়েন্দা বিভাগে একজন কর্নেল হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। এছাড়া একটি জনপ্রিয় আরবী অ্যাপলিকেশনেও এই নামের পরিচয় হিসেবে “রাজ আদালতের কর্নেল” হিসেবে দেখায়।
MenoM3ay নামের ওই অ্যাপ থেকে যেকোনো ফোন নম্বরের সঙ্গে যুক্ত ব্যবহারকারীর পরিচয় জানা যায়।
সৌদি প্রিন্স মোহাম্মদের সঙ্গে মিস্টার মুতারেবকে বিভিন্ন ইভেন্টে দেখা যায়।
মার্চ মাসে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি সফরের একটি ছবিতে মাহের মুতারেব নামে এক ব্যক্তিকে দেখা গিয়েছিল। এরপর আরও তিনটি ইভেন্টে তাকে প্রিন্স মোহাম্মদের সঙ্গে দেখা যাওয়ায় ধারণা করা হয় যে তিনি হয়তো কোন নিরাপত্তায় দাযড়ত্বে ছিলেন। তুরস্কের সরকার-পন্থী সংবাদপত্র “সাবাহ” সিসিটিভি ফুটেজ থেকে ওই ১৫ জনের ছবি প্রকাশ করে।
সেখানে দেখা যায় মিস্টার মুতারেব ২রা অক্টোবর সকাল ১০ টার দিকে ইস্তান্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশ করছেন। অর্থাৎ তাঁরা পৌঁছান মিস্টার খাসোগি সেখানে পৌঁছানোর তিন ঘণ্টা আগে। পরে বিকেল ৪টার দিকে তিনি কনসাল জেনারেলের বাডড়তে যান।
তুর্কি গণমাধ্যম জানায় যে মিস্টার মুতারেব, ড. তুবাইজির সঙ্গে একই বিমানে ইস্তান্বুলে এসেছিলেন এবং একই হোটেলে অবস্থান করেন।
একই দিন সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে স্কাই প্রাইম অ্যাভিয়েশনের আরেকটি ব্যক্তিগত বিমানে তিনি ইস্তান্বুল ছাড়েন বলে জানা যায়।
৩. আব্দুল আজিজ মোহাম্মদ এম আলহাওসাউই: নিউইয়র্ক টাইমসের খবর অনুযায়ী, ৩১ বছর বয়সী এই ব্যক্তি একজন ফরাসি নিরাপত্তা কর্মকর্তা, যিনি সৌদি রাজপরিবারের সঙ্গে কাজ করেছিলেন। বিশেষ করে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে সফরকারী নিরাপত্তা দলের সদস্য হিসাবেও তাঁর পরিচয় সনাক্ত হয়েছে। এছাঙা MenoM3ay অ্যাপেও এই নামের ব্যক্তির পরিচয় আসে সৌদি রয়াল গার্ড রেজিমেন্টের সদস্য হিসাবে। মিস্টার আলহাওসাউই একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ইস্তান্বুলে এসেছিলেন। বেলা ২টার আগেই তিনি বিমানবন্দরে পৌঁছে যান। এরপর তিনি সৌদি কনস্যুলেটের এক কিলোমিটার দক্ষিণে ওয়য়াইন্ডহাম গ্র্যান্ড ইস্তান্বুল লেভান্ত হোটেলে অবস্থান করছিলেন এবং তিনি ডা. তুবাইজির সঙ্গে ইস্তান্বুল ছেড়ো যান।

৪. থার গালেব টি আলহারবি: গত অক্টোবরে জেদ্দায় ক্রাউন প্রিন্সের প্রাসাদের প্রতিরক্ষায় সাহসী ভূমিকা রাখার জন্য রয়্যাল গার্ডে কর্মরত এই নামের এক ব্যক্তিকে লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছিল। ওই ঘটনায় এক বন্দুকধারীর গুলিতে পাঁচজন নিহত হয়।
ঊনচল্লিশ বছর বয়সী মিস্টার আলহারবি ব্যক্তিগত বিমানে ইস্তান্বুল পৌঁছেছিলেন এবং ড. তুবাইজির হোটেলে অর্থাৎ মুভেনপিকে অবস্থান করেন। পরে দুই নম্বর ব্যক্তিগত বিমানে ফিরে যান।

৫. মোহাম্মদ সাদ এইচ আলজাহরানী: MenoM3ay অ্যাপে এই নামের ব্যক্তির পরিচয় আসে রয়্যাল গার্ডের সদস্য হিসাবে।
২০০৭ সালের একটি ইভেন্টের ছবি ও ভিডিওতে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের পাশে দাঁডড়য়ে থাকা এক রক্ষীর গায়ে এই নামের ব্যাজ পরে থাকতে দেখা যায়, এমনটি জানিয়েছেন ইয়াদ আল-বাগদাদি নামে একজন অ্যাকটিভিস্ট।
তুর্কি মিডিয়া জানায়, ৩০ বছর বয়সী মিস্টার আলজাহরানী একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ইস্তান্বুল পৌঁছেছিলেন এবং তিনি ওয়াইন্ডহ্যাম গ্র্যান্ড হোটেলে অবস্থান করেছিলেন। তিনিও ব্যক্তিগত বিমানে তুরস্ক ছাড়েন। কিন্তু ওয়াশিংটন পোস্টে বলা হয়েছে, MenoM3ay অ্যাপে তালিকাভুক্ত ওই নম্বরে কল করার পর যিনি ফোনটি রিসিভ করেন তিনি মিস্টার খাসোগির নিখোঁজের সময় তুরস্কে থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

৬. খালিদ এধ জি আলোতাইবি: MenoM3ay অ্যাপে এই নামের ব্যক্তির পরিচয় সনাক্ত করা হয় রয়্যাল গার্ডের সদস্য হিসাবে।
ওয়াশিংটন পোস্টে বলা হয়েছে, সৌদি পাসপোর্টধারী একই নামের এক ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যেতেন। তাঁর ভ্রমণের সময় সৌদি রাজ পরিবারের ভ্রমণের সময়ের সঙ্গে মিলে যায়। ত্রিশ বছর বয়সী আলোতাইবি একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ইস্তান্বুল যান এবং ওয়াইন্ডহাম গ্র্যান্ড হোটেলে অবস্থান করেন। তিনি রাত ৯টা নাগাদ ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ অফিসে ছিলেন।

৭. নাইফ হাসান এস আলারিফি: এই নামের এক ব্যক্তির ফেসবুক অ্যকাউন্টে সৌদি আরবের বিশেষ বাহিনীর চিহ্ন সম্বলিত ইউনিফর্ম পরা ছবি দেখা গেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক সৌদি বংশোদ্ভূত সিরীয় উদ্যোক্তা কুতাইবি ইদলবি এই তথ্য জানান। তিনি মিস্টার খাসোগির পরিচিত ছিলেন।
MenoM3ay অ্যাপে এই মিস্টার আলারিফি নামের পরিচয় সনাক্ত করা হয় ক্রাউন প্রিন্সের অফিসের একজন কর্মচারী হিসাবে।
৩২-বছর বয়সী আলারিফি একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ইস্তান্বুল পৌঁছেছিলেন এবং পরে ওয়াইন্ডহ্যাম গ্র্যান্ডে অবস্থান করেন। বিকেল সোয়া ৪টার দিকে তিনি ব্যক্তিগত বিমানে ইস্তান্বুল ছাড়েন।

৮. মুস্তাফা মোহাম্মদ এম আলমাদানী: MenoM3ay অ্যাপে এই নামের পরিচয় সনাক্ত হয়েছে সৌদি আরবের গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসাবে।
৫৭ বছর বয়সী আলমাদানী ব্যক্তিগত বিমানে এসে পৌঁছেছিলেন এবং মুভেনপিক হোটেলে অবস্থান করেছিলেন।
তিনি রাত সাড়ে ১২টার দিকে একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ইস্তান্বুল ছাড়েন।

৯. মেশাল সাদ এম আলবোস্তানি: ৩২-বছর বয়সী এই ব্যক্তির নাম সম্বলিত ফেসবুক পেজে তাঁর পরিচয় দেয়া হয়েছে সৌদি বিমান বাহিনীর লেফটেন্যান্ট হিসেবে। এছাড়া MenoM3ay অ্যাপে এই নামের পরিচয় সনাক্ত হয়েছে সৌদি রয়্যাল গার্ডের দেহরক্ষী হিসাবে – মিস্টার ইদলবি এই তথ্য জানান। মিস্টার আলবোস্তানি বেলা ২টার দিকে ইস্তান্বুলে আসেন এবং ওয়াইন্ডহ্যাম গ্র্যান্ডে অবস্থান করেন। পরে ব্যক্তিগত বিমানে ফিরে যান। গত ১৮ই অক্টোবর তুরস্কের সরকার-পন্থী সংবাদপত্র “ইয়েনি সাফাক” জানায় যে মিস্টার আলবোস্তানী রিয়াদে একটি সন্দেহভাজন গাডড় দুর্ঘটনায় মারা গেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। যদিও এই বিষয়ে আর বিস্তারিত কোন তথ্য জানানো হয়নি।

১০. ওয়ালেদ আব্দুল্লাহ এম আলসেহরি: স্থানীয় গণমাধ্যমের মতে, সৌদি বিমান বাহিনীতে কর্মরত এই নামের এক ব্যক্তিকে ক্রাউন প্রিন্স গত বছর স্কোয়াড্রন লিডার পদে পদোন্নতি দেন। ৩৮-বছর বয়সী এম আলসেহরি ব্যক্তিগত বিমানে ইস্তান্বুল আসেন এবং মুভেনপিক হোটেলে অবস্থান করেন। পরে অপর ব্যক্তিগত বিমানে তিনি ফিরে যান।

১১. মনসুর ওথমান এম আবাহুসেইন: MenoM3ay অ্যাপে এই একই নামের ব্যক্তির পরিচয় সনাক্ত হয়েছে সৌদি গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসাবে – মিস্টার ইদলবি এই তথ্য জানান। ২০১৪ সালে স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি খবরে এই নামের এক ব্যক্তিকে জনপ্রতিরক্ষা বিভাগের জেনারেল ডিরেক্টরেটের কর্নেল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ৪৬-বছর বয়সী আবাহুসেইন বাণিজ্যিক ফ্লাইটে ইস্তান্বুল বিমানবন্দরে পৌঁছান এবং ওয়েন্ডহ্যাম গ্র্যান্ডে অবস্থান করে পরে ব্যক্তিগত বিমানে তুরস্ক ছেড়ে যান।

১২. ফাহাদ শাবিব আলবালাউই: এই নামের এক ব্যক্তির পরিচয় গবহড়গ৩ধু অ্যাপে রয়্যাল গার্ডের সদস্য হিসাবে দেয়া আছে।
৩৩-বছর বয়সী মিস্টার আলাবালাই ব্যক্তিগত বিমানে ইস্তান্বুলে আসেন। তিনি মুভেনপিকে অবস্থান করেন এবং পরে ব্যক্তিগত বিমানে ফিরে যান।

১৩. বদর লফি এম আলোতাইবি: মিস্টার ইদলবির মতে, এই নামের এক ব্যক্তির পরিচয় MenoM3ay অ্যাপে একজন প্রধান সৌদি গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসাবে দেয়া আছে। ৪৫ বছর বয়সী মিস্টার আলোতাইবি একটি ব্যক্তিগত বিমানে ইস্তাম্বুলে যান। তিনিও মুভেনপিকে অবস্থান করেন এবং একটি ব্যক্তিগত বিমানে ফিরে যান।

১৪. সাইফ সাদ কিউ আলকাহতানি: ওয়াশিংটন পোস্টের মতে, MenoM3ay অ্যাপে এই নামের পরিচয় সনাক্ত হয়েছে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের কর্মচারী হিসেবে। ৪৫ বছর বয়সী আলকাহতানি ব্যক্তিগত বিমানে ইস্তান্বুল পৌঁছান এবং মুভেনপিক হোটেলে অবস্থান করেন। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইটে উঠতে ইস্তান্বুল বিমানবন্দরের পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ বুথ অতিক্রম করেন।

১৫. তুর্কি মুসেররেফ এম আলসেহরি: ছত্রিশ বছর বয়সী এই ব্যক্তি একটি ব্যক্তিগত বিমানে ইস্তান্বুলে আসেন এবং মুভেনপিক হোটেলে অবস্থান করেন। পরে অপর আরেকটি ব্যক্তিগত বিমানে ইস্তান্বুল ছেড়ে যান।

-সূত্র বিবিসি বাংলা

থামছে না মাদকের বিস্তার

রিফান আহমেদ : রাজধানীসহ সারাদেশে মাদক পাচার, সেবন ও মজুতের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অভিযান অব্যাহত। গত মে মাসে মাদকের বিরুদ্ধে রীতিমত যুদ্ধ ঘোষণা করে প্রশাসন। সরকারের নির্দেশে কঠিন শাস্তির বিধান রেখে পাশ করা হয় মাদকবিরোধী আইন। তবুও থামানো যাচ্ছে না এর ভয়াবহ আগ্রাসন। সড়ক, রেল ও বিমান সবপথেই ঢুকছে মাদক, আর পৌঁছে যাচ্ছে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়। প্রশাসন যেমন তৎপর, তেমনি নিশ্চুপ নেই মাদক ব্যবসায়ীরাও। ব্যবসা নির্বিঘœ করতে তারা পরিবর্তন করেছে রুট। শুধু ‘রুট’ নয়, মাদক বহনকারী মাধ্যম থেকে শুরু করে পরিবর্তন এনেছে মাদকের রংয়েও। শুধু লালচে বা গোলাপী রংয়েই নয়, স¤প্রতি রাজধানীর রামপুরায় গন্ধহীন ধবধবে সাদা রংয়ের ৮০পিস ইয়াবাসহ এক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।
মাদক নির্মূলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের নেতৃত্বে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড, র‌্যাব-পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। মূল কার্যক্রমের মধ্যে এক নম্বরে ছিল সীমান্ত পথে মাদকদ্রব্যের অবৈধ প্রবেশ বা পাচার বন্ধ করা। আর দুই নম্বরে মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করা। রুটিনমাফিক প্রশাসনের মাদকবিরোধী এ অভিযানে প্রতিদিনই গ্রেফতার হচ্ছে শত শত মাদকসেবী ও মাদক বিক্রেতা। অভিযানে মৃত্যুও হয়েছে মাদকের অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পরিবহনে যুক্ত চোরকারবারীর। সূত্রমতে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকায় থাকা ৬১ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে সাবরাং ইউনিয়নের আলীরডেইল গ্রামের বাসিন্দা আকতার কামাল নিহত হন এবং নয়াপাড়ার শামসুল আলম মার্কিনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার হয় কক্সবাজার থেকে। তবে চলমান অভিযানে গ্রেফতার এড়াতে অপর চিহ্নিত ও শীর্ষ বিক্রেতারা রয়েছে আত্মগোপনে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নানা কৌশলে মাদক পাচারের চেষ্টা করছে তারা। তাই মাদক উদ্ধার হলেও থামছে না অবাধ বিক্রি ও সেবন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকায় রাজধানী ঢাকায় শীর্ষস্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৩৭। তাঁদের মধ্যে মো. নাদিম ওরফে পচিশ ও মো. নজরুল ইসলাম ওরফে নজু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। অন্যরা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও, মিরপুর-২, ভাষানটেকের মতো চিহ্নিত মাদকের স্পটগুলো ভেঙ্গে দেওয়ার পরেও সর্বত্রই দেখা মিলছে ভ্রাম্যমান মাদক কেনা-বেচা।
রাজধানীর বিভিন্ন মাদক স্পটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কারওয়ান বাজার রেললাইন বস্তিতে ভাসমান মাদক বিক্রেতাদের আনা-গোনা রয়েছে এখনও আগের মতো। এই বস্তির একটি অংশ ভেঙে দেওয়া হলেও বন্ধ হয়নি মাদক বেচা-কেনা। তেজগাঁওয়ের দক্ষিণ বেগুনবাড়ি এলাকায় রেললাইনের পাশে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে গাঁজা। মিরপুর-২ এর রাইনখোলা ঝিলপাড় বস্তিতে ভ্রাম্যমান মাদক ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে বিক্রি করছে মাদক। গত ২১ সেপ্টেম্বর এই বস্তিতে ইয়াবা কিনতে গিয়ে খুন হন পরিবহন শ্রমিক জাকির হোসেন (৩৫)। ভ্রাম্যমান মাদক বিক্রেতা বুলেট ছুরিকাঘাত করে জাকিরকে। ঘটনায় জড়িত রুবেল ও লিটনকে ঐ রাতেই এবং ৩ অক্টোবর বুলেটকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এদিকে ভাসানটেক এলাকায় মাদকের স্পট না থাকলেও একাধিক ভ্রাম্যমাণ মাদক বিক্রেতা রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট সংলগ্ন এক নম্বর বস্তির (কুমিল্লাপট্টি) স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, আলোচিত মাদক চোরাকারবারিরা রয়েছে আত্মগোপনে। তবে এলাকায় মাদক কেনাবেচা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে কতিপয় নব্য ব্যবসায়ী। তারা সহযোগীদের মাধ্যমে গোপনে মাদক সরবরাহ ও বিক্রি করছে। জেনেভা ক্যাম্পে উপর্যুপরি অভিযানের পর মাদক ব্যবসা কিছুদিন থেমে ছিল। নতুন করে আবারও একটি চক্রের সক্রিয় হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে প্রশাসনের কঠোর তদারকিতে মাদক পাচারের রুট পরিবর্তনেও বাধ্য হয়েছে ব্যবসায়ীরা। তাই ‘টেকনাফ বা কক্সবাজার’ রুট পরিবর্তিত হয়ে এখন দেশের সকল সীমানা দিয়ে মাদক প্রবেশ করছে এবং অভিনব পন্থায়। পরিবর্তন আনা হয়েছে মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত বাহকও। আগে শিশু ও নারীদের ব্যবহার করা হলেও এখন বাসচালক, অ্যাম্বুলেন্সচালক, কুরিয়ার সার্ভিস, ডিনার সেটের কার্টনসহ বিভিন্ন পন্থায় আনা হচ্ছে মাদক। কখনও কখনও চালান ধরা পড়লেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। গত এক বছরে চট্টগ্রাম, ফেনী, কক্সবাজার, ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশালে অন্তত অর্ধশত কুরিয়ার সার্ভিস থেকে ইয়াবা চালান আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব ঘটনায় প্রাপক গ্রেফতার হলেও প্রেরক সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। প্রেরকদের ঠিকানাগুলো সবসময় থাকে ভুয়া। এমনকি মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে খুঁজেও মিলে না কারও সন্ধান।
গত ২৭ আগস্ট মতিঝিলের সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস থেকে ইয়াবার চালানসহ ধরা পড়ে চার মাদক ব্যবসায়ী। প্যারাশুট ও ভাটিকা প্রসাধনীর কৌটায় করে ইয়াবা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। ঐ চালান রিসিভ করতে গেলে র‌্যাব তাদের গ্রেফতার করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে, কুরিয়ারের কর্মী বা তাদের এজেন্টরাই মাদক পাচারে জড়িত।
এ বিষয়ে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের এমডি দেলোয়ার হোসেন জানান, ‘আমরা সবসময় সতর্ক থাকি। তারপরও মাদক চোরাকারবারিরা এমনভাবে কাজ করে, যা সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকে। টেলিভিশন, ল্যাপটপসহ নানাবিধ পণ্যের আড়ালে এসব মাদকের চালান পাঠিয়ে থাকে। সবসময় এসব পণ্য আমাদের এজেন্টরা খুলে দেখতে পারে না। কেউ এগুলো সন্দেহও করে না। তবে প্রতিষ্ঠানের কোনও এজেন্ট বা কর্মীর সম্পৃক্ততা পেলে দ্রæতই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমরা মাদকের বিষয়ে কোনও ছাড় দেবো না।
র‌্যাব-১০ এর কমান্ডিং অফিসার (সিও) এডিশনাল ডিআইজি কাইয়ুমুজ্জামান বলেন, ‘কুরিয়ার সার্ভিসকে মাদকপাচারের একটা সুবিধাজনক রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে চোরাকারবারিরা। তবে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি কুরিয়ার সার্ভিসের সংশ্লিষ্টরা আন্তরিক হলে কুরিয়ারে মাদকপাচার বন্ধ করা সম্ভব।’
এদিকে মাদক নির্মূলে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন জিরো টলারেন্সে, তখনই মাদকসহ গ্রেফতার হয়েছে খোদ প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তা। মাদক পাচারে তাদের সংশ্লিষ্টতারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমন একটি চক্রকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন বিভাগের কর্মকর্তা মোল্যা নজরুল ইসলাম। তিনি জানান, গত মার্চে মুঠোফোনে আড়ি পেতে মুন্সিগঞ্জের শীর্ষস্থানীয় মাদক বিক্রেতা আরিফের সঙ্গে কিছু পুলিশ সদস্যের কথোপকথন জানতে পারে সিআইডি। এরই সূত্র ধরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও রাজবাড়ীর চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। শুধু পুলিশের নিচের দিকের সদস্যরাই নন, পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ আছে পুলিশের ওপরের দিকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও। গত জুনে রামুতে অভিযান চালিয়ে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় চট্টগ্রাম রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মনির-উজ-জামান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিয়াকত আলীকে তিরস্কার করেন এবং আসামির নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ দিতে চাপ সৃষ্টি করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে মনির-উজ-জামানকে বদলি করা হয়। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, গত এক বছরে মাদক কেনাবেচায় যুক্ত থাকার অভিযোগে শতাধিক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের কর্মকর্তা খোরশিদ আলম বলেন, জোরেশোরে যখন অভিযান চলে তখন ইয়াবার দাম বাড়ে। রাজধানী ঢাকায় চম্পা (ছোট ইয়াবা) সর্বনিম্ন ১০০ টাকায় ও আর সেভেন (বড় ইয়াবা) ২০০ টাকায় বিক্রি হতো। এখন ছোটটা ১৫০ থেকে ২০০ টাকা এবং বড়টা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় পৌঁছেছে। তবে প্রকাশ্যে বেচাকেনা ও সেবন আগের থেকে কমেছে। তবে উদ্বিগ্নের বিষয়, এখন নতুন নতুন বিক্রেতা দেখা যাচ্ছে, হাত বদল হচ্ছে ব্যবসার।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘গত ৬ মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত ৯ হাজার ৪৫৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৮৩ জন মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে ৩৫০ কোটি ৬০ লাখ টাকার।’
পুলিশ সদর দফতরের এআইডি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্সে। অভিযান চলছে। এটি একটি চলমান ও সমন্বিত প্রক্রিয়া। মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। নিয়মিত মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা আপডেট করা হচ্ছে। হানা দিয়ে তছনছ করা হচ্ছে তাদের আস্তানা। সবার সহযোগিতায় মাদক নির্মূল করা হবে। মাদকের সঙ্গে জড়িত কেউ রক্ষা পাবে না।’
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ৪ মে থেকে ১৭ অক্টেবর পর্যন্ত র‌্যাবের ৩ হাজার ৯০৮টি অভিযানে ৬ হাজার ৬৮৪ জন মাদক বিক্রেতা ও মাদকসেবীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৮৩ জন মাদক চোরাকারবারি নিহত হয়। এসব অভিযানে ৫৬ লাখ ৬৮ হাজার ১০০ পিস ইয়াবা, ২ হাজার ৩৯১ কেজি গাঁজা, ৫৩ হাজার ৬৫২ বোতল ফেনসিডিল, ১৫ কেজি ৮৫৭ গ্রাম হেরোইন, ৩০ হাজার ৩৮৬ বোতল বিদেশি মদ ও ১২ লাখ ৮৯ হাজার ৬৭৪ লিটার দেশি মদ উদ্ধার করা হয়।

ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কতটুকু মুহব্বত করতে হবে

আল্লামা মুহম্মদ গোলাম হুসাইন : মক্কা শরীফে যখন কুরাইশদের অত্যাচার বৃদ্দি পেল, তখন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবূ বরক ছিদ্দীক্ব আলাইহিস সালাম উনাকে ইঙ্গিতে বলে রাখলেন, “হে আবূ বকর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আপনি প্রস্তুত থাকবেন, যে কোন মূহুর্তে আল্লাহ পাক উনার পক্ষ হতে মক্কাভূমি ত্যাগ করে মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ আসতে পারে। নির্দেশ মুতাবেক একদিন নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী আলাইহিস সালাম উনাকে নিজ বিছানায় শোয়ায়ে এক মুষ্ঠি ধুলা হাতে নিয়ে শত্রুদের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করে ঘর হতে বের হলেন এবং হযরত আবূ বরক ছিদ্দীক্ব আলাইহিস সালাম উনর বাড়ী গিয়ে ঘরের দরজার কড়া নাড়া দিতে না দিতেই  হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম দরজা খুলে দিলেন। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্ব আলাইহিস সালাম উনাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি নিদ্রা যাননি?” জবাবে হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্ব আলাইহিস্ সালাম তিনি বলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম “যেদিন আপনি আমাকে প্রস্তুত থাকতে ইঙ্গিত করেছিলেন, সেদিন হতে একদিনের জন্যেও রাত্রে বিছনায় পিঠ লাগাইনি। কারণ আপনার ডাকের সাথে সাথে সাড়া দিতে না পারলে কি জানি কি বেয়াদবী হয়ে যায়।” মূলত: অন্তরে মুহব্বতের আগুণ একবার জবলে উঠলে এমনিভাবেই চোখের ঘুম হারাম হয়ে যায়।

(দুই)

হযরত আলী আলাইহিস সালাম উনাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে আপনার মুহব্বত কি রকম ছিল? তিনি বলেছিলেন যে, উনার আওলাদ মাতা-পিতা, ধন-সম্পদ এবং অত্যন্ত পিপাসার সময় ঠন্ডা পানির চেয়েও অধিক।

(৩)

ওহুদ যুদ্ধে প্রথম বিপর্যয়ের পর কুরাইশ বাহিনী পিছন থেকে এসে মুসলিম বাহিনীকে একযোগে আক্রমণ করে বসলো এবং সেই আক্রমণে ৭০ জন ছাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। স্বয়ং রাসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তীরের আঘাতে জর্জরিত হয়ে গেলেন এবং উনার নি¤œপাটির সম্মুখভাগের দুটি দান্দান মুবারক শহীদ হলো। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মুখ মুবারক থেকে খুন বয়ে যাচ্ছিল। তখন আবূ সাঈদ খুদরী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার পিতা হযরত মালেক ইবনে সিনান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার জখমী স্থানে মুখ লাগিয়ে খুন মুবারক চুষে খেয়ে ফেললেন, মাটিতে পড়তে দিলেন না। উনার এই মুহব্বত দেখে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করলেন-

অর্থ:- “আমার রক্ত যার রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে, তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না।”

(চার)

একদিন হযরত রসূলে করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিঙ্গা দিলেন। তাতে রক্ত বের হচ্ছিল। তা কোথাও মাটিতে পুঁতে রাখার জন্য হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত  আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হাতে তুলে দিলেন এবং ফিরে আসার পর হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, “রক্ত কোথায় পুঁতে এসেছ?” জবাবে তিনি বললেন ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমি তা পান করে ফেলেছি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমি তা পান করে ফেলেছি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, “যার শরীরে আমার খুন প্রবেশ করবে, তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করতে পারবে না।” কতটুকু মুহব্বত থাকলে এবাবে রক্ত পুঁতে না রেখে চুষে পান করা যায়, তা সহজে বোধগম্য।

(পাঁচ)

জলীলুল ক্বদর ছাহাবী, হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গভীরভাবে ভালবাসতেন। একদিন তিনি জানতে পারলেন যে, বছর নগরীতে এক ব্যক্তি রয়েছেন, যার চেহারা হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার চেহারা মুবারকের মত। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বছরার গভর্ণরের নিকট পত্র লিখে ঐ ব্যক্তিকে সম্মানে উনার নিকট পাঠাতে নির্দেশ দেন।

নির্দেশ মুতাবেক লোকটিকে উনার নিকট প্রেরণ করা হলে হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার শহরের বাইরে গিয়ে ঐ ব্যক্তিকে মহামর্যাদার সহিত অভ্যর্থনা জানান, উনার কপালে চুমু খান এবং বিপুল পরিমাণ উপহারসহ, রাজকীয় পুরস্কারে পুরস্কৃত করেন। লোকটির সাথে কোন পরিচয় নেই, সম্পর্ক  নেই, একটি মাত্র বাঁধন- দেখতে তিনি ছিলেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মত। তাই উনার এত আদর-আপ্যায়ন, যেন কোন রাজ্যের রাজকীয় স¤্রাট।

উল্লেখ্য হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুহব্বতের জোশে হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে অনেক কিছুই করেছেন। তিনি রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কর্তিত নথ, একখানা কাপড় ও কিছু কেশ মুবারক সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন এবং মৃত্যুর সময় ওছীয়ত করে গিয়েছিলেন, এগুলো যেন উনার নাক কান ও চোখের মধ্যে রেখে উনাকে দাফন করা হয়। হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু আনহু হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অগাধ ভালবাসতেন বলেই অনুসরণ করতেন উনাকে কদমে কদমে। উনার প্রসঙ্গে হযরত আবূ দারদা রদ্বিয়াল্লাহু  আনহু তিনি বলতেন, “আমি হযরত মুয়বিয়া রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার নামাযের চেয়ে আর কারো নামাযে রসুলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে অধিক মিল খুঁজে পাইনি।

(ছয়)

একজন ছাহাবী একদিন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট বললেন, “হুযূর! আপনার সাথে আমার এমন মুহব্বত যে, অনেক সময় আপনাকে দেখার জন্য মন পাগলর হয়ে উঠে। তাই ছুটে আসি আপনর দরবারে কিন্তু আপনর মৃত্যুর পর আপনি থাকবেন নবী আলাইহিস সালামগণের জামায়াতে আর আমরা থাকবো বহু দূরে। তখন আপনার জিয়ারত আমাদের নছীব হবে না।” হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপ করে রইলেন। তখন এ আয়াত শরীফ নাযিল হলো-

ومن يطع الله والرسول فاولئك مع الذين انعم اللهعليهم من النبين وصديقين والشهداء والصلحين.

অর্থ:- “যে আল্লাহ তায়ালা ও তদীয় রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পরিপূর্ণ অনুসরণ করবে, সে সেইসব লোকদের সঙ্গে থাকবে, যাঁদের উপর আল্লাহ পাক উনার নিয়ামত থাকবে এবং উনারাই হলেন- নবী, ছিদ্দক্বী, শহীদ এবং নেককারগণ।” (সূরা নিসা-৬৯)

আয় আল্লাহ পাক! আপনি আমাদের সকলকে হুববে রসূল ও দীদারে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নসীব করুন। (আমীন)

(হাকেম, তিররানী, দারু কুতনী, আবু নঈম, ইবনুহিব্বান, খুজাইমা, খাছায়েছুল কুবরা, সীরাতুন নবী সাইয়্যিদুল মুরসালীন, দুররুল মুখতার ইত্যাদি।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনুদান দিলেন নড়াইলের আ’লীগ নেতা আমিনুর রহমান হিমু

এসকে,এমডি ইকবাল হাসান : দুর্গোৎসব উপলক্ষে নড়াইল-২ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগ নেতা শেখ মোঃ আমিনুর রহমান হিমু বিভিন্ন পূজামন্ডপ পরিদর্শন করেছেন। এসময় তিনি সংশ্লিষ্টদের হাতে আর্থিক অনুদান তুলে দেন।


খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে, নড়াইল-২ আসনে শিক্ষানুরাগী, শিল্পপতি বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় যুব ও ক্রীড়া উপকমিটির সদস্য শেখ মোঃ আমিনুর রহমান হিমু বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে জনসেবা করে যাচ্ছেন। সাধারণ মানুষ ও নেতা-কর্মীদের কাছে তিনি বিপদের বন্ধু হিসাবেই পরিচিত। বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণসহ দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা, অসুস্থ ব্যাক্তি, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার, শীতার্ত মানুষের উন্নয়নে অর্থ প্রদান করেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘায়ু কামনাসহ স্বপ্নপূরণে নির্বাচনী এলাকায় তিনি ব্যাক্তিগত কোটি টাকা ব্যয়ে উন্নয়ন কাজ করেছেন। মঙ্গল ও সোমবার উন্নয়ন কাজের অংশ হিসাবেই তিনি হিন্দু ধর্মালম্বীদের দুর্গোৎসব পালনে আর্থিক অনুদান দেন। এসময় লোহাগড়া উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সদস্য প্রবীর কুমার কুন্ডু মদন, কাশিপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি মোঃ রেজাউল করিম, মাজসেবক লিয়াকত হোসেন বিশ্বাস, ছাত্রলীগ নেতা হাসান, রোমান রায়হান, সজিব সহ দলীয় নেতৃবৃন্দ, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও সমর্থকরা সাথে ছিলেন।

বিআরটিএ’র এক সাবেক দুর্নীতিবাজের ভেলকি!

ইবনে মান্নান : দুর্নীতির দায়ে চাকরি হারালেও এখন সাবেক কর্মস্থলে প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ হারাননি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) আত্মস্বীকৃত এক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। সরকারের এই সেবা সংস্থা থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের নিবন্ধন, পুননিবন্ধন, ফিটনেস সনদ প্রদানসহ নানা কাজে এখনও পর্দার অন্তরাল থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন এই দুর্নীতির দায়ে বহিষ্কৃত কর্মকর্তা। চলতি বছরে নিরাপদ সড়ক সংক্রান্ত সামাজিক আন্দোলন ও পরবর্তীতে সরকার ও প্রশাসনের নানা পদক্ষেপের কারণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে বিআরটিএ। বিআরটিএ’র বিভিন্ন দুর্নীতি, অনিয়মের উপর সরেজমিন অনুসন্ধান করতে গিয়ে উঠে আসে এই কর্মকর্তার নাম। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের স্বার্থে কাজ করতে গিয়ে বিআরটিএ’র একটি সূত্র থেকে উঠে আসে নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের সাবেক সহকারী পরিচালক আমিনুল হক সরকারের নাম। সূত্রের দেওয়া তথ্য ও বিভিন্ন নথিপত্র যাচাই-বাছাই ও অনুসন্ধান করা হলে উঠে আসে আরও ভয়াবহ চিত্র। দিনাজপুরের আশরাফ আলী সরকারের পুত্র আমিনুল হক সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির এমন অভিযোগ রয়েছে চাকরিতে যোগদানের বছর থেকেই।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা বিভাগের নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের ড্রাইভিং লাইসেন্সের ২১ হাজারেরও বেশি নথি গায়েব করে শত শত কোটি সরকারের রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে বহিষ্কৃত হন সহকারী পরিচালক আমিনুল হক সরকার। পরিদর্শক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া দিনাজপুরের আমিনুল হক সরকার চাকরি জীবনের শুরু থেকেই ছিলেন আপাদমস্তক দুর্নীতিতে ডুবে। অধিকাংশ সময় ঢাকা বিভাগের অধীনে বিভিন্ন সার্কেলে নিযুক্ত থাকায় রাতারাতি দুর্নীতির বরপুত্রদের একজনে পরিণত হন আমিনুল। বিগত বিএনপি জামাত জোট সরকারের আমলে আমিনুল পরিণত হন অধরা দুর্নীতিবাজদের একজনে। মুলত বিএনপি জামাত ঘরোনার এই কর্মকর্তা বিগত ১/১১ এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গঠিত ট্রুথ কমিশনে মুসলেকা দিয়ে আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজের তালিকায় নাম লেখান। ওই সময় প্রায় ২০ লাখ টাকা জরিমানা দিয়ে সেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে কানাডায় পাড়ি জমান আমিনুল।

২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসলে ২০০৯ সালে দেশে ফিরে রাতারাতি আওয়ামীলীগপন্থী হয়ে যান আমিনুল। ট্রুথ কমিশনে মুচলেকা দেওয়া অন্যান্য দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে এক হয়ে উচ্চ আদালতের আদেশে পুনরায় চাকরিতে ফেরেন আমিনুল। চাকরিতে ফিরেই নিযুক্ত হন নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পরিচালক হিসেবে।

২১ হাজার নথি গায়েব করলেও বিআরটিএ’র নারায়ণগঞ্জের প্রাক্তন সহকারী পরিচালক আমিনুল হক সরকারসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০০৯ এর ২৪ মে তারিখ হতে ২০১১ সালের ২৯ মার্চ পর্যন্ত সময়ে ৫২১টি নথি গায়েবের তদন্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন। নথি গায়েবের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেলে অনুসন্ধান শেষ করতে পারেনি সংস্থাটি। গায়েব হওয়া নথি উদ্ধারে বিআরটিএ’কে বার বার নোটিশ করলেও তা দুদককে দিতে পারেনি বিআরটিএ। অবশেষ তদন্ত ওই পর্যায়ে স্থগিত করতে বাধ্য হয় দুদক। তবে জড়িত সহকারী পরিচালক আমিনুল হক সরকারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয় দুদক। দুদকের নির্দেশনার পর বিআরটিএ আমিনুল হক সরকারকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে।

দুদক সূত্রে জানা যায়, গয়েব হওয়া নথিপত্রের মধ্যে রয়েছে মোটরযান লাইসেন্স, মোটরযান কর, নিবন্ধীকরণ, মালিকানা বদলি, ফিটনেস সার্টিফিকেট ইস্যু ও নবায়ন, রুট পারমিট ইস্যু ও নবায়ন, মোটর ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন ও মোটর ড্রাইভিং স্কুল রেজিস্ট্রেশন, ইনস্ট্রাক্টর লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন, প্রাক-রেজিস্ট্রেশন পরিদর্শন ফি বাবদ আট খাতের নথিপত্র।

অভিযোগের বিষয়ে দুদক সূত্রে জানা যায়, বিআরটিএ’র নারায়ণগঞ্জ সার্কেল অফিসে ২০০৯ এর ২৪ মে হতে ২০১১ সালের ২৯ মার্চ পর্যন্ত সময়ে যানবাহন শাখার ৫২১টি রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত বিভিন্ন ফি সরকারি কোষাগারে জমা না করে আত্মসাৎ করার অভিযোগ ছিল। এছাড়া ঢাকা জোনের নথিপত্রসহ কয়েক হাজার নথি গায়েবের অভিযোগ ছিল। ২০১১ সালে উত্থাপিত এই অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে নামে দুদক। প্রাথমিকভাবে দুদকের তৎকালীন উপপরিচালক আবদুল আজিজ ভূঁইয়ার নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ অনুসন্ধানেও উদ্ধার হয়নি হারিয়ে যাওয়া নথিপত্র। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার অনুসন্ধান কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। শেষ পর্যন্ত নথিপত্র গায়েবের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে সাজা দেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে দুদকের পক্ষ থেকে। দুদকের সুপারিশে আমিনুল হক সরকারকে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বিভাগীয় শাস্তির অধীন বহিষ্কার করলেও এখনও বহাল তবিয়তে প্রভাব বজায় রেখেছেন দুর্নীতির এই বরপুত্র।

ঢাকা বিভাগের অধিকাংশ সার্কেলে রয়েছে আমিনুল হক নিয়ন্ত্রিত একাধিক সিন্ডিকেট। যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান, যানবাহনের মালিকানা পরিবর্তন, চোরাই ও শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আমদানি করা গাড়ির নিবন্ধন করানো ও ফিটনেস সনদ প্রদানের মত সেবা প্রাপ্তিতে গ্রাহকের উপর প্রভাব বিস্তার করছে এসব সিন্ডিকেট।

সম্প্রতি আমিনুল হক সরকারের সহযোগীতায় রাজধানীর বেশ কিছু লক্কর-ঝক্কর বাস ও যানবাহনের ফিটনেস সনদ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই অভিযোগের অনুসন্ধান করতে গিয়ে পাওয়া যায় আরও ভয়াবহ তথ্য। একই নম্বর ও ঠিকানার একাধিক যানবাহনকে নিবন্ধন করিয়ে দিচ্ছে আমিনুল হকের এই সিন্ডিকেট। বিশেষ করে চোরাই ও রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আনার যানবাহনের ক্ষেত্রে এই অসৎ কাজটি করছে তারা। আর কাজটি এত নিখুত ভাবে করছে, যে মূল সার্ভারে যাচাই ছাড়া তা ধরা সম্ভব নয়।

আমিনুল হক সরকারের সঙ্গে একই ব্যাচে নিয়োগ পাওয়া এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে জানান, আমিনুল চাকরি থেকে বরখাস্ত হলেও এখনও প্রধান কার্যালয় ও ঢাকার আশপাশের সার্কেল অফিসে প্রভাব বজায় রেখেছে। গাড়ির লাইসেন্স প্রদান, গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট প্রদান, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানসহ বিআরটিএ’র প্রদান করা বিভিন্ন সেবাতে হস্তক্ষেপ করে আমিনুল।

তিনি বলেন, আমিনুলের নিয়ন্ত্রিত একটি গ্রুপ (দালাল, কর্মকর্তা, কর্মচারী) চোরাই গাড়ির নিবন্ধন, অদক্ষদের ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান, লক্কর-ঝক্কর গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট পাইয়ে দেওয়ার মত কাজে জড়িত রয়েছে।

বিআরটিএ ও দুদকের দেওয়া তথ্যানুযায়ি, আমিনুল হক সরকারের জন্মস্থান দিনাজপুর ও বর্তমান বসবাসের স্থান রামপুর বনশ্রী আবাসিক এলাকায় অনুসন্ধান চালানো হয়। সরেজমিনে অনুসন্ধানে আমিনুল হকের নামে-বেনামে শত শত কোটি টাকার সম্পত্তির তথ্য পাওয়া যায়। বনশ্রীতে নিজের সাত তলা ভবনসহ ওই এলাকায় বিভিন্ন ব্লক প্রায় ১০টির মত ফ্লাট রয়েছে। বনশ্রী কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশের বাণিজ্যিক প্লটটিও সম্প্রতি আমিনুল হক ক্রয় করে সেখানে মার্কেট করার পরিকল্পনার করছে বলেও প্রমাণ পাওয়া যায়।

এছাড়া পার্শবর্তী আফতাব নগর আবাসিক এলাকায় তার স্ত্রী ও শ্বশুর বাড়ির আত্মীয়দের নামে বেশ কয়েকটি প্লট রয়েছে বলেও তথ্য পাওয়া যায়। গাজীপুরে কয়েক বিঘা সম্পত্তিও রয়েছে আত্মস্বীকৃত এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার নামে।

আমিনুলের দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধানে তার বর্তমান নিবাস বনশ্রীতে অনুসন্ধান চালালে জোবায়ের নামে তার এক সহযোগীর নাম উঠে আসে। স্থানীয়রা জানান, হজ এজেন্সির নামে দালালী, প্লট-ফ্লাট কেনা-বেচা, ড্রাইভিং লাইসেন্স করিয়ে দেওয়ার  মত মধ্যস্থতাকারীর এই জোবায়ের আমিনুল হকের সকল অপকর্মের প্রধান সহযোগী। পরিচয় গোপন করে বিভিন্ন সময়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ পেতে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিদের পাঠানো হয় জোবায়েরের কাছে। এসময় জোবায়ের মনের অজান্তেই আমিনুল হক সরকার সম্পর্কে দেন নানা তথ্য। জানান তার বর্তমান প্রভাব প্রতিপত্তি সম্পর্কেও। আর আমিনুলের সকল অবৈধ সম্পত্তিরও সকল হিসাবও রয়েছে জোবায়েরের কাছে।

তবে এসব বিষয়ে কথা বলতে চাইলে আমিনুল হক সরকার নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। একই সঙ্গে প্রতিবেদকের মোবাইল নম্বর ব্লক করেও রাখেন আমিনুল।

এবিষয়ে বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান মশিউর রহমান বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই আমিনুল হক সরকারের ব্যাপারে বিআরটিএ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বরখাস্ত হয়েছেন। তবে তার নিয়ন্ত্রণে বিআরটিএ’র কিছু কর্মকর্মা-কর্মচারী রয়েছেন এমন অভিযোগের কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে নেই।

নির্যাতনের অভিযোগে মরহুম ভাইয়ের স্ত্রী ও ভাতিজার সংবাদ সম্মেলন

ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্ম সচিব মো. আমজাদ আলী সরকারের মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি থেকে তার দুই সন্তান ও বিধবা স্ত্রীকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি মৃত্যুর পূর্বেই তার পেনশন ও পারিতোষিকের নমিনি হিসেবে স্ত্রীকে মনোনয়ন করে রাখলেও তাতেও বাধ সেজেছেন তার ভাইয়েরা। আমজাদ আলী সরকারের মেজভাই আজহার আলী সরকার, সেজ ভাই বিআরটিএ থেকে দুর্নীতির দায়ে বহিষ্কার হওয়া আমিনুল হক সরকার এবং ছোট ভাই আলতাফ আলী সরকারের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা হয়েছে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ক্রাব) অডিটোরিয়ামে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন মৃত আমজাদ আলী সরকারের স্ত্রী মোসা. আমিনা পারভিন এবং দুই পুত্র মো. আশফাক আলী সরকার সাগর ও মো. আহসান আলী সরকার সৈকত।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত অভিযোগে আমিনা পারভিন বলেন, স্বামীর মৃত্যুর দিন থেকেই তার স্বামীর ভাই বোনেরা সম্পত্তি ও টাকা পয়সা আত্মসাতের ষড়যন্ত্র শুরু করে। তিনি বলেন, স্বামীর মৃত্যুতে যখন আমি ও আমার সন্তানরা শোকে স্তব্ধ, যখন আমার স্বামীর দাফনও শেষ হয়নি ঠিক তখন আমার দেবর ননদেরা ব্যস্ত ছিলো ঘর থেকে টাকা পয়সা, বিভিন্ন সম্পত্তির দলিল সরিয়ে ফেলার কাজে। স্বামীর মৃত্যুর কিছু দিন পর থেকেই প্রকাশ পেতে থাকে আমার শ^শুরবাড়ির আত্মীয়দের হয়রানী ও নির্যাতন। স্বামীর পেনশন ও পারিতোষিক সুযোগ সুবিধা পেতে তার মনোনীত নমিনি হিসেবে আমি যখন সচিবালয়ে যোগাযোগ শুরু করি ঠিক তখনই তাদের ষড়যন্ত্রের বিষয়টি আচ করতে পারি। সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ি স্বামীর পেনশনের অর্থ পাওয়ার সকল অধিকার থাকলেও তাতে বাধ সাজেন আমার শ^শুর বাড়ির স্বজনরা। আমার সেজ দেবর আমিনুল হক সরকার তাদের জীবিত পিতা মো. আশরাফ আলী সরকারকে পেনশনের টাকার একমাত্র হকদার দাবি করে মন্ত্রণালয়ে একটি আপত্তিপত্র দাখিল করেন।
আমিনা পারভিন বলেন, স্বামীর পেনশন ও পারিতোষিকের অর্থ পেতে যখন মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করি, তখন ওয়ারিশ সংক্রান্ত জটিলতা সমাধান করেই আমাকে যোগাযোগ করতে বলা হয়। এরপর আমি আমার শ^শুর ও দেবর ননদদের সঙ্গে কথা বললে তারা নগদ দুই লাখ টাকা ও স্বামীর পেনশন থেকে আরও ৪০ লাখ টাকা দাবি করেন। এই অর্থ পেলে তারা সকল আপত্তি তুলে নিবেন এবং আমার সন্তানদের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বুঝিয়ে দিবেন বলে শর্ত দেন। আমি তাদের শর্তে রাজি হলে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি সমঝোতাপত্রও উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে করা হয়। আর আমাকে নগদ দুই লাখ টাকা দেওয়া ছাড়াও দিতে হয় ১০ লাখ টাকা করে চারটি চেক। শর্ত থাকে স্বামীর পেনশনের টাকা থেকে ধাপে ধাপে টাকা দিলেই তারা চেক ফেরত দিবে। আমি প্রথম কিস্তি পেনশনের অর্থ পাওয়া মাত্রই তাদের ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করি এবং সেই সঙ্গে সমঝোতা চুক্তির বাকি শর্তগুলোও তাদের বাস্তবায়ন শুরু করতে বলি। কিন্তু তারা তাদের বাকি শর্ত না মেনে আমার বিরুদ্ধে দুটি চেক ডিজওনারের মিথ্যা মামলা দায়ের করে।
তিনি বলেন, যখন এমন অবস্থাতে জীবন যাপন করছি, ঠিক তখনই আমার সেঝ দেবর আমিনুল হক সরকারের দুর্নীতি নিয়ে বেশ কয়েকটি পত্রিকায় খবর ছাপা হয়। এসব খবর ছাপা হওয়ার পেছনে আমার যোগসাজস আছে ধারণা করে তারা আমার উপর অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
আমিনা পারভিনের এমন অভিযোগের ব্যাপারে অভিযুক্ত আমিনুল হক সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।

তত্ত্বাবধায়কের দুর্নীতিতে সেবা বঞ্চিত আহসান উল্লাহ মাস্টার হাসপাতালের রোগীরা

রানা হানিফ : গাজীপুর শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের জরুরী বিভাগের ইনচার্জ নিয়োগ নিয়ে বড় ধরণের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. কমর উদ্দিনের একচ্ছত্র ক্ষমতার ব্যবহার ও অনিয়মের কারণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ হাসপাতালের অন্যান্য চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চাকরিনীতিমালা লঙ্ঘন করে দীর্ঘ ১৬ বছর হাসপাতালের জরুরী বিভাগের ইনচার্জের দায়িত্বে ছিলেন সরদার তারিক মাহমুদ। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নির্দেশে ওই পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। নার্সিং ও মিডওয়াইফাইরি অধিদফতরের মহাপরিচালক গত বছর ১৩ জুন এক দাফতরিক আদেশের মাধ্যমে শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার, সিনিয়র স্টাফ নার্স, স্টাফ নার্স ও অন্যান্য নার্সিং কর্মকর্তাদের ২ বছর পর পর ইনচার্জের দায়িত্ব পরিবর্তন করার আদেশ দেন। ওই আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০ জুন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো কমর উদ্দিনের স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে জরুরী বিভাগের ইনচার্জ পদ থেকে সরদার তারিক মাহমুদকে অব্যাহতি দিয়ে মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে স্থলাভিষ্কিক্ত করা হয়। কিন্তু মোস্তাফিজুর রহমান দুই বছর ওই দায়িত্বে থাকা তো দূরের কথা মাত্র চার মাসের মাথায় তাকে ওই পদ থেকে অব্যাহিত দিয়ে হাসপাতালের তত্ত¡াবধায়ক মো. কমর উদ্দিন নিজের একক সিদ্ধান্তে সরদার তারিক মাহমুদকে পুনরায় জরুরী বিভাগের ইনচার্জের দায়িত্ব দেন।
অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘ ১৬ বছর জরুরী বিভাগের ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত ছিলেন। রোগীর খাবারের মান, সরকারি ওষুধ খোলাবাজারে বিক্রি, অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয়সহ নানা অসৎ কাজের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ টাকার উপার্জন করেন তারিক মাহমুদ। আর তার এসব কাজে সরাসরি হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক মো. কমর উদ্দিন জড়িত বলে একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন।
এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. কমর উদ্দিনকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, “আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে চাই না, তবে যদি আমার সাক্ষাৎকার ছাপাতে চান, তবে সরাসরি অফিসে এসে কথা বলুন।”

প্রার্থীদের যা জানা জরুরি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। ধারণা করা হচ্ছে, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হবে। নির্বাচনী কর্মকাণ্ড আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শুরু হওয়ার নিশ্চয়তা থাকলেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান—এমন অনেক ব্যক্তিই নির্বাচনী বিধিবিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না। সম্ভাব্য প্রার্থীদের অবগতির জন্য নির্বাচনসংক্রান্ত কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিধিবিধান নিচে তুলে ধরা হলো।

সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে সম্ভাব্য প্রার্থীকে বাংলাদেশের যেকোনো নির্বাচনী এলাকার ভোটার হতে হবে, কিন্তু যে এলাকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, সেই এলাকার ভোটার হওয়া তাঁর জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তবে মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবকারী ও সমর্থনকারীকে অবশ্যই ওই নির্বাচনী এলাকার ভোটার হতে হবে। প্রতিটি মনোনয়নপত্র প্রার্থী বা তাঁর প্রস্তাবকারী বা সমর্থনকারী রিটার্নিং অফিসার বা সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে দাখিল করবেন, যিনি তারিখ ও সময় উল্লেখ করে প্রাপ্তিস্বীকার করবেন। এখন পর্যন্ত অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিধান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও)-তে নেই, যদিও নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে আইন সংশোধনের প্রস্তাব করেছে বলে শুনেছি।

প্রার্থীকে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে একটি হলফনামা, নির্বাচনে সম্ভাব্য ব্যয়ের উৎস ও সর্বশেষ বছরের আয়কর বিবরণীর কপি জমা দিতে হবে। অতীতে অনেকে শুধু আয়কর বিবরণী জমা দেওয়ার এনবিআর কর্তৃক প্রদত্ত প্রত্যয়নপত্র মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল করেছেন, যা আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে আরও জমা দিতে হবে জামানত হিসেবে ২০ হাজার টাকা। তবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় কোনো মিছিল ও মহড়া করা যাবে না।

অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিসম্পন্ন মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময়ে বাতিল হতে পারে। তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধনযোগ্য ভুলের জন্য সাধারণত মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয় না। তবে হলফনামায় উল্লেখ করা কোনো তথ্য মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় পরিবর্তন বা সংশোধন করা যাবে না।

আমাদের দেশে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়ার কিছু বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত দৃষ্টান্ত আছে। তবে গত পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে, বিশেষ করে ফেনীতে এটি নগ্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৫ সালের পৌরসভা নির্বাচনে ফেনী, দাগনভূঞা ও পরশুরাম উপজেলায় মনোনয়নপত্র জমাদানে বাধার কারণে মোট ৫১টি পদের বিপরীতে দুই মেয়রসহ ৪৭ জনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তাই আগামী নির্বাচনে বিশেষ প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা প্রদানের আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

হলফনামায় আট ধরনের তথ্য জমা দিতে হয়: প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, বর্তমান ও অতীতের ফৌজদারি মামলার বিবরণ, পেশা, আয়ের উৎস, নিজের এবং নির্ভরশীলদের সম্পদ ও দায়দেনার বিবরণ এবং অতীতে সংসদ সদস্য হলে ভোটারদের কাছে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি ও তা বাস্তবায়নের বিবরণ। হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে কিংবা তথ্য গোপন করলে মনোনয়নপত্র বাতিল, এমনকি পরবর্তী সময়ে নির্বাচনও বাতিল হতে পারে। তাই হলফনামা প্রস্তুতের ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে, কারণ ভবিষ্যতে নির্বাচন কমিশন হলফনামা যাচাই-বাছাই করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এ ব্যাপারে বিশেষ করে যত্নবান হওয়ার আরও কারণ হলো যে হলফ করে মিথ্যা তথ্য দেওয়া ফৌজদারি দণ্ডবিধির ১৮১ ধারার অধীনে একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ছাড়া যেকোনো ব্যক্তি একজন প্রার্থীর হলফনামা চ্যালেঞ্জ করে ‘বিরুদ্ধ হলফনামা’ দাখিল করতে পারবেন।

ঋণ ও বিলখেলাপিরা সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অযোগ্য। আরও অযোগ্য বিদেশি সাহায্যপুষ্ট বেসরকারি সংস্থার নির্বাহী, যাঁর পদত্যাগ বা অবসরের পর তিন বছর অতিবাহিত হয়নি। একই ধরনের বিধান সরকারি কর্মকর্তা এবং সামরিক কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ ছাড়া অযোগ্য নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে অন্যূন দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তি, যাঁর মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত হয়নি।

তবে নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তি কখন থেকে—বিচারিক আদালত কর্তৃক প্রথম দণ্ডপ্রাপ্তির দিন থেকে না আপিল প্রক্রিয়া নিঃশেষিত হওয়ার পর—তা আমাদের উচ্চ আদালত এখনো সুরাহা করেননি। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বনাম আবদুল মুক্তাদির চৌধুরী [২৬ বিএলডি ২৬১ (২০০২)] মামলার রায়ে বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীন ও বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী হিসেবে এরশাদের কখন থেকে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অযোগ্যতা শুরু হবে, সে ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন। বিচারপতি জয়নুল আবেদীন রায় দেন যে আপিল–প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। পক্ষান্তরে বিচারপতি খায়রুল হকের মতে, দণ্ড ঘোষণার দিন থেকেই দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অযোগ্য হবেন। পরবর্তীকালে আপিল বিভাগ এ বিষয়টি সুরাহা করেননি। এমনকি ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর বনাম নির্বাচন কমিশন [৬২ ডিএলআর (এডি) ২০১০] মামলায়ও হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ বিষয়টি এড়িয়ে যান। তবে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বনাম আবদুল মুক্তাদির চৌধুরী, ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর বনাম বাংলাদেশ এবং মো. মামুন বনাম ওয়ালিদ হাসান বনাম রাষ্ট্র (ক্রিমিন্যাল মিসিলেনিয়াস কেস, ১০০০৯/২০০৭) মামলার রায় থেকে এটি সুস্পষ্ট যে উচ্চ আদালত দণ্ডিত অপরাধীর দণ্ড ও কনভিকশন স্থগিত করলে তিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবেন।

একজন ব্যক্তি দুইভাবে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন: স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা রাজনৈতিক দল কর্তৃক মনোনীত প্রার্থী হিসেবে। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে, যিনি অতীতে কখনো সংসদ সদস্য ছিলেন না, নির্বাচনী এলাকার ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরসংবলিত একটি তালিকা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হবে। অতীতে সংসদ সদস্য ছিলেন এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য নয়। ১ শতাংশ ভোটারের তালিকা সম্পর্কে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। কারণ, এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত কেউ তাঁর স্বাক্ষর জাল বলে দাবি করলে মনোনয়নপত্র বাতিল হতে পারে।

নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দলের সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি বা সমপর্যায়ের পদাধিকারী ব্যক্তিকে একটি প্রত্যয়নপত্র দাখিল করতে হবে যে তাঁকে দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন প্রদান করা হয়েছে। দল একাধিক ব্যক্তিকে এ ধরনের প্রত্যয়নপত্র দিতে পারে।

নিবন্ধিত দলের মনোনয়ন নির্ধারণের লক্ষ্যে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের ভোটে একটি প্যানেল তৈরি করা বাধ্যতামূলক। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অধ্যাদেশের মাধ্যমে আরপিও সংশোধন করে দলীয় মনোনয়ন বোর্ড কর্তৃক তৃণমূলের তৈরি এ প্যানেল থেকে মনোনয়ন দেওয়ার বিধান করা হয়। তবে অধ্যাদেশটি ২০০৯ সালে সংসদে অনুমোদনের সময় এ বিধানটি শিথিল করে শুধু প্যানেলটি বিবেচনায় নেওয়ার বিধান করা হয়, যার ফলে দলীয় মনোনয়নে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের ভূমিকা নিছক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমিত হয়ে পড়ে।

মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের বিধানটি সম্ভাব্য প্রার্থীদের, বিশেষত দলীয়ভাবে মনোনীত প্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত একটি লিখিত নোটিশ, প্রত্যাহারের দিনে বা তার আগে, রিটার্নিং অফিসারের কাছে নিজে বা প্রতিনিধি মারফত দাখিল করে তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে পারবেন। দলীয়ভাবে মনোনীত প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কোনো আসনে দলের পক্ষ থেকে একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হলে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমার মধ্যে দলের সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি বা সমপর্যায়ের পদাধিকারী ব্যক্তিকে দলের চূড়ান্তভাবে মনোনয়নপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম লিখিতভাবে নিজে বা প্রতিনিধি মারফত রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অবহিত করতে হবে।

দলের পক্ষ থেকে প্রতিটি আসনের জন্য একজনকে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত রিটার্নিং কর্মকর্তাকে অবহিত করলে, প্রতিটি আসনে দলের প্রাথমিকভাবে মনোনয়নপ্রাপ্ত অন্যদের মনোনয়নপত্র আপনা থেকেই বাতিল হয়ে যাবে; অর্থাৎ দল থেকে কেউ মনোনয়ন চাইলে, দলের প্রত্যয়নপত্র নিয়ে তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিলে এবং তিনি দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন না পেলে তাঁর পক্ষে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকবে না। তাই কোনো প্রার্থী যদি মনে করেন যে তিনি দল থেকে মনোনয়ন পাবেন না, কিন্তু তিনি প্রার্থী হতে চান, তাহলে তাঁর জন্য দলের মনোনয়ন চাওয়া হবে আত্মঘাতী।

নদী বাঁচাতে অপূর্ব এক আত্মদানের কথা

নদী বাঁচাতে জীবন দিলেন তিনি। জন্ম হলো এক মর্মান্তিক বিয়োগগাথার, শ্রদ্ধায় অবনত হলো মস্তক। ভারতের গঙ্গা নদীকে দূষণ থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন তিনি। করেছিলেন ১১১ দিন অনশন। সরকার তাঁর কথা শোনেনি। অনশনরত অবস্থাতেই ভারতের হরিদ্বারে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। গঙ্গাকে বাঁচাতে বহু লড়াই করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা এই মানুষটির নাম জি ডি আগরওয়াল। গত ২২ জুন থেকে হরিদ্বারে অনশনরত ছিলেন তিনি। সরকার আবেদন শোনেনি, তিনিও ছাড়লেন এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর মায়া।

জি ডি আগরওয়াল স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানাদ নামেও পরিচিত ছিলেন। পরিবেশকর্মী জি ডি আগরওয়াল ১১১ দিন অনশনরত ছিলেন। গত বুধবার উত্তরাখন্ড পুলিশ তাঁকে জোর করে হাসপাতালে ভর্তি করে। আইআইটি কানপুরের প্রফেসর ছিলেন জি ডি আগরওয়াল। কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সদস্যও ছিলেন তিনি। ২০১৪ সালে কাঠমান্ডুতে জি ডির সঙ্গে শেষ দেখা। দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশ জলবায়ু উন্নয়ন প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায্য ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ে এক বিশাল বাহাসে তাঁকে নিয়ে আসা হয়েছিল। নাম-পরিচয়ে তিনি ছিলেন স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ। দক্ষিণ এশিয়ার নানা দেশ থেকে আসা, এমনকি ভারতের তরুণ পরিবেশকর্মীদের অনেকেই তাঁকে ধর্মগুরু কিছিমের লোক মনে করেছিলেন। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (আইআইটি) সাবেক অধ্যাপক ও ভারতের কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের একসময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য (মেম্বার সেক্রেটারি) জি ডি আগরওয়াল দাড়ি আর গেরুয়া পোশাকে হারিয়ে যাননি কখনো।

সেবার কাঠমান্ডু আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে ভারতের ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন নিয়ে সবাই আশঙ্কা ব্যক্ত করছিলেন। গেরুয়াবসনা জেডিরও শঙ্কা অব্যক্ত থাকেনি। তবে তিনি বরাবরই নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদিকে ভাই বলেই উল্লেখ করছিলেন। ধর্মের লেবাস পরা বেনিয়ারা যে দিকে দিকে রাষ্ট্রক্ষমতা কবজা করছে, তাতে তাঁর কোনো সন্দেহ ছিল না। তবে বিজেপি-মনোনীত মোদির প্রতি একটু যেন ভরসার গন্ধ ছিল তাঁর কথাবার্তায়। দামোদর একটা নদীর নাম, নদীর নামের মানুষ নদীকে অন্য চোখে দেখবে, ব্যবসার চোখে দেখবে না—এই আবেগপ্রবণ ব্যাখ্যা বা বিশ্বাস কি তাঁর ছিল?

অনশন শুরুর আগে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে গঙ্গা রক্ষার আহ্বান জানিয়ে যে চিঠি তিনি লেখেন (২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮), সেখানেও তিনি ভাই বলেই সম্বোধন করেছিলেন। প্রায় চার মাস উত্তরের অপেক্ষায় থেকে প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিতীয় চিঠিও লিখেছিলেন ভাই সম্বোধনে (১৩ জুন ২০১৮)। দ্বিতীয় চিঠিরও উত্তর না পেয়ে ২০১৮ সালের ২২ জুন থেকে আমরণ অনশন শুরু করেন জি ডি। অনশনের মাসখানেকের মাথায় গঙ্গা বাঁচাও আন্দোলনের সক্রিয় কর্মীরা তাঁদের প্রতিবাদ আন্দোলন আরও বেগবান করে তোলেন। ভারতের উত্তরাখন্ড রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী হারিস রাওয়াত জলমানব বা ওয়াটারম্যান হিসেবে নিরাপদ পানি আন্দোলনের পুরোধা ড. রাজেন্দ্র সিংসহ অনেকে নানা প্রতিবাদে যোগ দিতে থাকেন। তাঁরা জে ডির জীবন রক্ষার্থে অনশন শেষ করার জন্য রাজনৈতিক নেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। রাহুল গান্ধী আর শরৎ যাদবের সঙ্গে দেখা করেন। সিদ্ধান্ত নেন, হৃষিকেশ থেকে দিল্লি পর্যন্ত গঙ্গা পদযাত্রা হবে। এর মধ্যে অনশনের দেড় মাস কেটে যায়, মোদির নীরবতা কাটে না। এবার জি ডি শেষ চিঠি লেখেন প্রধানমন্ত্রীকে (৫ আগস্ট)। এ চিঠিতে আর ভাই বলে সম্বোধন না করে শুধুই ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ লিখেছিলেন তিনি। বলেছিলেন ‘আমার অনুরোধগুলো সরকার না মানলে আমি অনশন চালিয়ে যাব। আর তার জন্য মরতে হলে মরব।’

কী অনুরোধ ছিল তাঁর
গঙ্গাকে দূষণমুক্ত করার জন্য গঙ্গা মহাসভার (গঙ্গা রক্ষার জন্য একটি জনপ্রিয় কিন্তু অরাজনৈতিক গণ-উদ্যোগ) বানানো খসড়া বিলটিকে তাড়াতাড়ি লোকসভায় পেশ করুন; আলোচনা শুরু হোক। এই খসড়া বিল প্রায় তিন বছর ফাইলের নিচে চাপা পড়ে আছে। লম্বা আলোচনায় কালক্ষেপণ না করে বিলের প্রথম অধ্যায়ের প্রথম থেকে নবম অনুচ্ছেদ পর্যন্ত সুপারিশগুলোকে অবিলম্বে রাষ্ট্রপতির অরডিন্যান্স জারির মাধ্যমে কার্যকর করুন। কারণ, গঙ্গার মৃত্যু আপনাদের আলোচনার জন্য থেমে থাকবে না।

অলকানন্দা, ধৌলিগঙ্গা, নন্দাকিনী, পিন্দার ও মন্দাকিনীতে নির্মাণাধীন সব জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ অবিলম্বে বন্ধ করুন।

গঙ্গা অববাহিকায় প্রস্তাবিত অন্য সব জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বিশেষ করে হরিদ্বার-কুম্ভসহ অববাহিকার যেসব জায়গায় খননকাজ চলছে, তা বন্ধ করুন।

নদী ও নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে বালু উত্তোলন এবং গাছ কাটা বন্ধ করুন।

গঙ্গার পরিচ্ছন্নতা আর সুস্থতার সঙ্গে প্রবাহ বজায় রাখার বিষয়গুলো তদারকের জন্য পূর্বপ্রতিশ্রুতিমোতাবেক একটা স্বাধীন নিরপেক্ষ সংবিধানিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করুন।

এসব কোনো অনুরোধেরই জবাব দেননি প্রধানমন্ত্রী মোদি। তবে শেষ চিঠি পাওয়ার পর তাঁকে একটা চিঠি লিখেছিলেন মোদি সরকারের জলসম্পদ ও ‘গঙ্গা বাঁচাও’ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী নিতিন গড়কড়ি। চিঠিতে তিনি অনশন তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু দাবি না মানা হলে অনশন চালিয়ে যাবেন বলে জি ডি আগেই ঘোষণা করেছিলেন। বিজেপির গেরুয়াবসনা নেত্রী উমা ভারতীকেও পাঠিয়েছিল হাইকমান্ড। জি ডিকে টলানো যায়নি।

লেবু, মধু, জল ছাড়া আর কিছু গ্রহণ করেননি জি ডি দীর্ঘ ১০৯ দিন। তারপর বন্ধ করে দেন সেই জলগ্রহণ। পুলিশ এসে চ্যাংদোলা করে হৃষিকেশের এইমস হাসপাতালে নিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করে। সেই চাপেই তাঁর প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায়। ডাক্তার মৃত্যুসনদে লিখেছেন, জি ডি মরেছেন হার্ট অ্যাটাকে, অনশনে নয়।

অনশনে সফলতার স্বাদ জি ডি প্রথম পান ২০১০ সালে উত্তরাখন্ডে গঙ্গাকে বেঁধে ৬০০ মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ লহারিনাগ পালা প্রকল্প নিয়ে। সেবার তাঁর আমরণ অনশনের সামনে সরকার প্রকল্পের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা মেনে নিয়ে পিছু হটে। এরপর মনমোহন সরকার গঙ্গার ওপর যেকোনো প্রকল্প আর গঙ্গার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ ঠিক রাখার দায়িত্ব দিয়ে গঠন করেন ন্যাশনাল গঙ্গা রিভার বেসিন অথোরিটি বা জাতীয় গঙ্গা অববাহিকা কর্তৃপক্ষ (এনজিআরবিএ)। দাবি অনুযায়ী দেশের প্রধানমন্ত্রীকে এই কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান করা হয়। কিন্তু কর্তৃপক্ষের সভা আর ডাকা হয় না। আজ–কাল করে ১৮ মাস কেটে যায়। জি ডি আবার অনশনে বসেন। অনশনের আড়াই মাসের মাথায় জলগ্রহণও বন্ধ করে দেন। সরকারের টনক নড়ে, তাঁকে বিমানে করে দিল্লির হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মনমোহন সিং কাঙ্ক্ষিত সভা তলব করেন। জি ডি অনশন ভাঙেন। এবার সবাই ভেবেছিল, মোদি শেষ পর্যন্ত ছুটে আসবেন, আশ্বাসে অনশন প্রত্যাহার করবেন জি ডি। সেটা হলো না। গঙ্গা তার এক প্রেমিককে হারাল।

ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, আইআইটি কানপুরের অধ্যাপক আর কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সদস্যসচিব একজন আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞানী আর আন্দোলনের অগ্রপথিক প্রফেসর গুরুদাশ আগরওয়াল ২০১১ সালে হঠাৎ কেন সাধুর দীক্ষা নিয়ে স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ হলেন? সেই বছরে (২০১১) টানা ৬৮ দিন অনশনে থেকে তরুণ সাধক স্বামী নিগামান্দ সরস্বতী মৃত্যুবরণ করেন। তিনিও চেয়েছিলেন গঙ্গা দূষণমুক্ত হোক। হরিদ্বার আর কুম্ভ মেলা এলাকায় বেআইনিভাবে খনিজ উত্তোলন বন্ধ হোক। খনি–দস্যুদের হাতে গঙ্গা দূষিত হচ্ছিল, খোলা খনির অনিরাপদ বর্জ্য নদীকে মেরে ফেলেছিল, সাধুসন্তদের একত্র করে এক গণ-আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন তিনি। জি ডির কি মনে হয়েছিল, যে দেশের মানুষ নদীকে ভগবান জ্ঞান করে, সে দেশে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে নদী রক্ষার একটা উপায়ে সাধুদের সংগঠিত করা যাবে? ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের নানা দিক নিয়ে জি ডির নিজস্ব মূল্যায়ন ছিল। তিনি একটা নতুন পথ খুঁজছিলেন কি? সে আলোচনা আমাদের এগোয়নি। নেপালের এভারেস্টের দিকে চোখ রেখে বলেছিলেন, ‘বলব তোমাকে।’ সেটা আর শোনার পথ রইল না। তবে গঙ্গার পক্ষে লড়াইয়ের লোকের অভাব হবে না। গুরুদাশরা মরে না। গঙ্গা মরবে না।

কেন ইরাকি নারীদের এই দুর্দশা?

আরব বিশ্বের মধ্যে ইরাকই ছিল প্রথম দেশ, যেখানে একজন নারী কেবিনেট মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইরাক ছিল সেই দেশ, যেখানে প্রায় ১০০ বছর ধরে ইরাকি নারীদের চিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার অনুমতি ছিল। অথচ সেই দেশেই এখন নারীদের চরম দুর্দশা। আধুনিক ইরাকে নারীর অধিকার আজ ভূলুণ্ঠিত।

আজ অনেক ইরাকি নারীকে পরিবারের সব কাজ একা হাতে করতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তারা পুরুষের কাছ থেকে খুব সামান্যই সহায়তা পেয়ে থাকে। কেউ কেউ তাদের সন্তান, বাবা-মা ও ভাইবোনদের দেখভাল করতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ, পুরুষেরা সব যুদ্ধে ব্যস্ত বা যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরাকে নারীর প্রতি সহিংসতাও চরম আকার ধারণ করেছে। গত কয়েক বছরে রাজধানী বাগদাদের ধর্মীয় মিলিশিয়ারা বেশ কয়েকজন যৌনকর্মীকে হত্যা করেছে এবং সাংবাদিককে নির্যাতন করেছে। এদিকে, জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসআইএল হাজার হাজার ইয়াজিদি নারীকে ক্রীতদাসীতে পরিণত করেছে, যাদের অনেকে এখন নিখোঁজ।

গত দুই মাসে অন্য আরেকটি দুঃখজনক প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে চারজন গুরুত্বপূর্ণ নারীকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁরা ইরাকের বিভিন্ন শহরে বসবাস করতেন এবং তাঁদের পেশাও ছিল ভিন্ন। তাঁদের মধ্যে কেবল দুটি বিষয়ে মিল ছিল। প্রথমত, তাঁরা সবাই নারী ছিলেন এবং দ্বিতীয়ত, তাঁরা সবাই নিজ নিজ পেশায় সফল ছিলেন।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর সাবেক ‘মিস বাগদাদ’ তারা ফারেসকে বাগদাদে দিনের আলোয় গুলি করে হত্যা করে দুই মোটরসাইকেল আরোহী। ইরাকের আরেক শহর বসরার একটি বাজারে গত ২৫ সেপ্টেম্বর গুলিতে প্রাণ হারান মানবাধিকারকর্মী সৌদ আল-আলী৷

এর আগে ২৩ আগস্ট কসমেটোলজিস্ট রাশা আল হাসান ও প্লাস্টিক সার্জন রাফিফ আল-ইয়াসিরিকে তাঁদের বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের কারণে ইয়াসিরির মৃত্যু হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করছে। কিন্তু এ ব্যাপারে এখনো পরিষ্কার করে কিছু বলেনি। ফলে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়েছে যে তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে।

৭ অক্টোবর বসরায় আরও দুজন নারীকে হত্যা করা হয়েছে। এঁদের একজন একটি বিউটি পারলারের মালিক এবং অপরজন অধিকারকর্মী। এসব হত্যার ঘটনায় মনে হয়েছে, হত্যাকারীরা ব্যাপকভাবে প্রশিক্ষিত এবং এগুলো কোনো এলোপাতাড়ি হামলা নয়, বরং পরিকল্পিত। পেশাগত ক্ষেত্রে সফল আরও বেশ কয়েকজন নারী হত্যার হুমকি পেয়েছেন।

এটি এখনো স্পষ্ট নয় যে এই হত্যাকাণ্ডগুলো একক কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ কি না। তবে এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ইরাকি নারীদের কাছে একটি বার্তা গেছে যে: ‘সমাজের ঐতিহ্যবাহী সীমাবদ্ধতাগুলো আপনাদের ভেঙে ফেলা উচিত হবে না।’

আজকের দিনে অনেক ইরাকি পুরুষ হীনম্মন্যতায় ভুগছে এবং তারা পেশাগত ক্ষেত্রে নারীর সাফল্যকে হুমকি হিসেবে দেখছে। আর এ কারণে এই নারীদের হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। এসব পুরুষ ভাবতে পারে, স্বাভাবিকভাবেই এসব হত্যাকাণ্ডের পর নারীদের মাঝে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়বে এবং অনেক নারী তাদের পেশা নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয়কে পুনর্বিবেচনা করবে।

তারপরও আশাবাদী হওয়ার কিছু কারণ রয়েছে। কেননা, এসব হত্যাকাণ্ডের ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। ইরাকি সমাজ ব্যাপকভাবে এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষ আবার এসব হত্যাকাণ্ডের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছে। টেলিভিশন উপস্থাপক হায়দার জাভির টুইটারে টুইট করেছেন যে লোকজনের উচিত ফারেসের মৃত্যু নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা বন্ধ করা। তিনি তাঁকে একজন পতিতা বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তিনি খুন হওয়ার যোগ্য ছিলেন এবং এ ঘটনার কোনো তদন্তের প্রয়োজন নেই। তাঁর এই মন্তব্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো উত্তাল হয়ে ওঠে। হাজার হাজার মানুষ হায়দার জাভিরের এ মন্তব্যের নিন্দা জানায়। এই মন্তব্যের জেরে অবশেষে তাঁর চাকরি চলে যায়।

এসব প্রতিক্রিয়া এটা দেখিয়েছে যে, ইরাকে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হতে শুরু করেছে এবং সমাজের একটি বড় অংশ সফল নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে প্রত্যাখ্যান করছে।

ইরাকি সমাজে নারীর জন্য প্রচুর বাধা বিদ্যমান এবং এখানে নারী-পুরুষের বৈষম্য প্রবল। যুদ্ধের কারণে ইরাকের নারী ও পুরুষের মাঝে সব সময় একটা ভীতি কাজ করে। এই ভীতি নারীর অধিকারের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে গবেষণা করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ইরাকে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত ও তাদের সার্বিক পরিস্থিতি উন্নত করতে পারে, এমন একটি রূপরেখা প্রণয়ন করা দরকার।

একটা বিষয় স্পষ্ট, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আইনের শাসনের উন্নতি করতে হবে। ইরাকের মানবাধিকার পরিস্থিতি খুবই খারাপ। অন্তত কয়েক ডজন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অপরাধীদের দমনে বা বিচারের ক্ষেত্রে পুলিশ, আইনজীবী বা বিচারকেরা কতখানি অযোগ্য। তদন্তের পদ্ধতিগুলো সীমিত, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে বিচার করা হয় এবং নির্যাতনের অভিযোগগুলো সাধারণভাবে তদন্ত করা হয় না। দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে যুক্ত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের মোকাবিলায় সাধারণত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডের পর সরকারি কর্মকর্তারা ঘোষণা করেন যে তদন্ত শুরু করা হয়েছে, কিন্তু প্রায় সময় দেখা যায়, এসব তদন্ত আর আলোর মুখ দেখে না।

ইরাকে সমাজের সব স্তরের নারীর ব্যাপক সুরক্ষা প্রয়োজন এবং নারীদের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য বর্তমান সরকারের এখন বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার ও আইনের শাসনকে উন্নত করার মধ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু করার সুযোগ রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু ৭৪ সালে শুরু করেছিলেন কিন্তু…

বাংলায় ১০টি বর্ণ লাগে ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ লিখতে । এই দশ বর্ণ-ই যেন বাংলার দশ দিক। আমাদের ‘দশ দিগন্ত’ বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আমাদের নিয়ে যাওয়া শুরু করেছিলেন বিশ্ব প্রাঙ্গনে। যেখানে তিনি জানান দিয়েছিলেন বাঙালি জাতিসত্ত্বার কথা। আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য আর সমৃদ্ধ সংস্কৃতির কথা। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে। বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষার জন্য জেলে গেছেন। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তিনি বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন দেখেছেন। হাজার বছর ধরে বাঙালি জাতি নিজেদের ভূমির জন্য সংগ্রাম করেছে। একটি স্বাধীন দেশের জন্য অযুত-নিযুত প্রাণ দিয়েছে। সেই জাতির জন্য একটি দেশ এনে দিয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। তাই বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। তিনি সেই ভাষার ঋণের কথা ভুলে যাননি। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য দেশ হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। এর মাত্র আটদিন পর, ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন বাংলায়। জাতিসংঘে এটি ছিল প্রথম বাংলায় ভাষণ। তাতে করে বাংলাভাষা পেয়েছে বিশ্ব দরবারে সম্মানের আসন, আর বাংলাভাষায় কথা বলা মানুষরা পেয়েছে গর্ব করার অবকাশ।

বিশ্ব পরিসরে এর আগে এমন করে বাংলা ভাষাকে কেউ পরিচয় করিয়ে সম্মান দেয়নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে প্রথম বাঙালি, যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর নোবেল পাওয়ার পর বাংলাভাষা সম্পর্কে বিশ্ববাসী প্রথম জেনেছিলো। কিন্তু উনি বিশ্বাঙ্গনের কোথাও বাংলায় বক্তব্য রাখেননি। ১৯৯৮ সালে অমর্ত্য সেন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল পুরস্কার পাওয়া তিনি দ্বিতীয় বাঙালি। তিনিও তাঁর বক্তব্যটি প্রদান করেছিলেন ইংরেজিতে। বাংলাদেশের নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনুস ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনুস চাইলে তাঁর নোবেল বক্তব্য পুরোটি বাংলায় দিতে পারতেন। তাতে বাংলা ভাষা বিশ্বজনের কাছে আরো পরিচিত ও সম্মানিত হতে পারত। তিনি তাঁর ৩৫ মিনিটের ভাষণের মধ্যে মাত্র দেড় মিনিট বাংলায় বলেছেন।

বঙ্গবন্ধুর পরে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে চেতনায় ধারণ করে লালন করেছেন আমাদের বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই তিনি জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিতে পেরেছেন সুদৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করে। এরপর শেখ হাসিনা যতবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এসেছেন, ততবার বাংলাকে জাতিসংঘের অফিশিয়াল ভাষার স্বীকৃতি দেয়ার দাবি করেছেন।

বিশ্বব্যাপী ৩৫ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। তবে বাংলা ভাষা বলতে বিশ্ব বাংলাদেশকেই বুঝে। মাতৃভাষা বিবেচনায় বাংলা এখন চতুর্থ। সংখ্যার দিক দিয়ে সপ্তম। ইউনেস্কো ২০১০ সালে বাংলা ভাষাকে পৃথিবীর সব চেয়ে সুরেলা ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্বের ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা পড়ানো হয়। বাংলা ভাষার এতো গৌরবময় বিষয় থাকার পরও সারা বিশ্বে তার তেমন কোনো প্রচারের ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ সরকার।

অথচ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী শুধু ভাষার নয়, ‘বাংলাদেশ’ নামটির অতি সহজভাবে একটি ইতিবাচক প্রচার করা যেত। কীভাবে? এই উত্তরটি দেওয়ার আগে বলে নিই তাতে দেশের কী লাভ হত? মোটাদাগে বলতে গেলে মানুষ সব সময় তার পরিচিত গণ্ডির মধ্যে থাকতে চায়। আপনি বাজারে একটি পণ্য কিনতে গিয়ে পরিচিত দেশের পণ্যটাই কিনেন। তেমনি বিশ্ববাজারে সমমানের কোনো পণ্য যদি অপরিচিত কোনো দেশের হয়, মানুষ তাতে নির্ভর না করে পূর্বপরিচিত দেশের জিনিসে আস্থা রাখে।

‘কীভাবে’র উত্তরে বলা যায়- বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বাংলাদেশের মানুষ আছে। দেশের আদলে অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রবাসীরা জাতীয় শহীদ দিবস পালন করেন ২১শে ফেব্রুয়ারিতে। দেশে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সবাই ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানালেও প্রবাসে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় একত্রে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ সীমিত। তাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে দিবসটির আয়োজন করতে বাধ্য হন।

বিচ্ছিন্ন আয়োজনটা যদি প্রতিটা দেশে সম্মিলিতভাবে বিদেশিদের সম্পৃক্ত করে ব্যাপক আয়োজনে করা যেত তাহলে কী হতে পারত? স্থানীয় প্রতিটা দেশের গণমাধ্যমে বাংলাদেশ একটি ইতিবাচক জায়গা দখল করতে পারত। তা ঘটতে পারতো বিশ্ব গণমাধ্যমেও। যার ফলে আমাদের বৈচিত্রময় সংস্কৃতির কথা বিশ্ববাসী জানতে পারত। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবন, রাতারগুলের মতো আরো অনেক দর্শনীয় স্থান ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ছাড়াও প্রতিটা জেলায় কিছু না কিছু আছেই দর্শনীয়। শুধু বিশ্বব্যাপী প্রচারের অভাবে আমাদের পর্যটনের আজ করুণ অবস্থা। আমাদের গৌরব আর বৈচিত্রময় সংস্কৃতি এবং প্রকৃতি বিশ্ব দরবারে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারলে পর্যটনে সুবাতাস বয়ে যেতে পারত।

প্রশ্ন আসতে পারে, সম্মিলিত আয়োজন করাটা কি এতোই সোজা? হ্যাঁ, একেবারেই সোজা। প্রতিটা দেশে বাংলাদেশের হাইকমিশন এই কাজটি সহজেই করতে পারেন সবাইকে নিয়ে। বাংলাদেশ হাইকমিশন অফিস যদি সেই দেশে যারা নিয়মিত ২১শের আয়োজন করে তাদের এবং কমিউনিটির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করে তাহলে অধিকাংশ প্রবাসীই সম্মানিত বোধ করবে কাজটি করতে। তখন অর্থনৈতিক বিষয়টাও বড় কোনো ব্যাপার হবে না। পাশের দেশ ভারতের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘দেওয়ালি’ এক সময় নিজে বড় করে আয়োজন করতো। এখন আমেরিকা সরকার নিজে তা উৎসব আকারে উদযাপন করে। চীন সরকার তাদের নিজেদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিশ্বব্যাপী। এ সব আয়োজনে সেই সব দেশের কী লাভ হচ্ছে তা সরকার ভালো করেই জানেন। এমন অসংখ্য নজির চোখের সামনে থাকার পরেও আমাদের সরকারের এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেই। অন্যান্য দেশের এইসব সম্মিলিত আয়োজন দেখে বাংলাদেশি প্রবাসীদের আফসোস করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না।

বাংলাদেশের মানুষ সাধারণত কেউ নিজে উদ্যোগী হয়ে কাজ করার চেয়ে কোনো দায়িত্ব পেলে তা পালন করতে স্বস্তিবোধ করে। পরনিন্দা আর পরশ্রীকাতরতা এর বড় কারণ। এ জন্যই হয়তো কোনো হাইকমিশনার নিজে উদ্যোগী হয়ে এ ধরনের কাজ হাতে নেন না। যারা প্রবাসে সরকারিভাবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তারা প্রত্যেকেই দেশপ্রেমী তাতে সন্দেহ নেই। তারা প্রত্যেকে দেশের জন্য কিছু করতে পারলে গর্ববোধ করেন। সরকারের পক্ষ থেকে যদি একটি চিঠিতে ২১শের আয়োজনটি সম্মিলিতভাবে করার কথা বলা হয় তাহলে প্রতিনিধিরা এই উদ্যোগটি স্বাচ্ছন্দ্যে নিতে পারতেন প্রবাসীদে নিয়ে। এমনকি সরকারের এতে কোনো অতিরিক্ত ব্যয় পর্যন্ত হবে না। প্রবাসীরা অর্থনৈতিক এবং শারীরিকভাবে সহযোগিতা করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন সরকারের একটি আহ্বানের জন্য। সরকারের পক্ষ থেকে ‘একটি চিঠি কি লেখা যায় একুশের জন্য’?