আল্লামা মুহম্মদ গোলাম হুসাইন : মক্কা শরীফে যখন কুরাইশদের অত্যাচার বৃদ্দি পেল, তখন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবূ বরক ছিদ্দীক্ব আলাইহিস সালাম উনাকে ইঙ্গিতে বলে রাখলেন, “হে আবূ বকর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আপনি প্রস্তুত থাকবেন, যে কোন মূহুর্তে আল্লাহ পাক উনার পক্ষ হতে মক্কাভূমি ত্যাগ করে মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ আসতে পারে। নির্দেশ মুতাবেক একদিন নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আলী আলাইহিস সালাম উনাকে নিজ বিছানায় শোয়ায়ে এক মুষ্ঠি ধুলা হাতে নিয়ে শত্রুদের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করে ঘর হতে বের হলেন এবং হযরত আবূ বরক ছিদ্দীক্ব আলাইহিস সালাম উনর বাড়ী গিয়ে ঘরের দরজার কড়া নাড়া দিতে না দিতেই  হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক আলাইহিস সালাম দরজা খুলে দিলেন। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্ব আলাইহিস সালাম উনাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি নিদ্রা যাননি?” জবাবে হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্ব আলাইহিস্ সালাম তিনি বলেন, ইয়া রসূলাল্লাহ ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম “যেদিন আপনি আমাকে প্রস্তুত থাকতে ইঙ্গিত করেছিলেন, সেদিন হতে একদিনের জন্যেও রাত্রে বিছনায় পিঠ লাগাইনি। কারণ আপনার ডাকের সাথে সাথে সাড়া দিতে না পারলে কি জানি কি বেয়াদবী হয়ে যায়।” মূলত: অন্তরে মুহব্বতের আগুণ একবার জবলে উঠলে এমনিভাবেই চোখের ঘুম হারাম হয়ে যায়।

(দুই)

হযরত আলী আলাইহিস সালাম উনাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে আপনার মুহব্বত কি রকম ছিল? তিনি বলেছিলেন যে, উনার আওলাদ মাতা-পিতা, ধন-সম্পদ এবং অত্যন্ত পিপাসার সময় ঠন্ডা পানির চেয়েও অধিক।

(৩)

ওহুদ যুদ্ধে প্রথম বিপর্যয়ের পর কুরাইশ বাহিনী পিছন থেকে এসে মুসলিম বাহিনীকে একযোগে আক্রমণ করে বসলো এবং সেই আক্রমণে ৭০ জন ছাহাবী শাহাদাত বরণ করেন। স্বয়ং রাসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তীরের আঘাতে জর্জরিত হয়ে গেলেন এবং উনার নি¤œপাটির সম্মুখভাগের দুটি দান্দান মুবারক শহীদ হলো। হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মুখ মুবারক থেকে খুন বয়ে যাচ্ছিল। তখন আবূ সাঈদ খুদরী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার পিতা হযরত মালেক ইবনে সিনান রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার জখমী স্থানে মুখ লাগিয়ে খুন মুবারক চুষে খেয়ে ফেললেন, মাটিতে পড়তে দিলেন না। উনার এই মুহব্বত দেখে হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করলেন-

অর্থ:- “আমার রক্ত যার রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে, তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না।”

(চার)

একদিন হযরত রসূলে করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিঙ্গা দিলেন। তাতে রক্ত বের হচ্ছিল। তা কোথাও মাটিতে পুঁতে রাখার জন্য হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত  আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার হাতে তুলে দিলেন এবং ফিরে আসার পর হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, “রক্ত কোথায় পুঁতে এসেছ?” জবাবে তিনি বললেন ইয়া রসূলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমি তা পান করে ফেলেছি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমি তা পান করে ফেলেছি হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, “যার শরীরে আমার খুন প্রবেশ করবে, তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করতে পারবে না।” কতটুকু মুহব্বত থাকলে এবাবে রক্ত পুঁতে না রেখে চুষে পান করা যায়, তা সহজে বোধগম্য।

(পাঁচ)

জলীলুল ক্বদর ছাহাবী, হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গভীরভাবে ভালবাসতেন। একদিন তিনি জানতে পারলেন যে, বছর নগরীতে এক ব্যক্তি রয়েছেন, যার চেহারা হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার চেহারা মুবারকের মত। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বছরার গভর্ণরের নিকট পত্র লিখে ঐ ব্যক্তিকে সম্মানে উনার নিকট পাঠাতে নির্দেশ দেন।

নির্দেশ মুতাবেক লোকটিকে উনার নিকট প্রেরণ করা হলে হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার শহরের বাইরে গিয়ে ঐ ব্যক্তিকে মহামর্যাদার সহিত অভ্যর্থনা জানান, উনার কপালে চুমু খান এবং বিপুল পরিমাণ উপহারসহ, রাজকীয় পুরস্কারে পুরস্কৃত করেন। লোকটির সাথে কোন পরিচয় নেই, সম্পর্ক  নেই, একটি মাত্র বাঁধন- দেখতে তিনি ছিলেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মত। তাই উনার এত আদর-আপ্যায়ন, যেন কোন রাজ্যের রাজকীয় স¤্রাট।

উল্লেখ্য হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মুহব্বতের জোশে হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে অনেক কিছুই করেছেন। তিনি রসূলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কর্তিত নথ, একখানা কাপড় ও কিছু কেশ মুবারক সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন এবং মৃত্যুর সময় ওছীয়ত করে গিয়েছিলেন, এগুলো যেন উনার নাক কান ও চোখের মধ্যে রেখে উনাকে দাফন করা হয়। হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু আনহু হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অগাধ ভালবাসতেন বলেই অনুসরণ করতেন উনাকে কদমে কদমে। উনার প্রসঙ্গে হযরত আবূ দারদা রদ্বিয়াল্লাহু  আনহু তিনি বলতেন, “আমি হযরত মুয়বিয়া রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনার নামাযের চেয়ে আর কারো নামাযে রসুলে পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে অধিক মিল খুঁজে পাইনি।

(ছয়)

একজন ছাহাবী একদিন হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট বললেন, “হুযূর! আপনার সাথে আমার এমন মুহব্বত যে, অনেক সময় আপনাকে দেখার জন্য মন পাগলর হয়ে উঠে। তাই ছুটে আসি আপনর দরবারে কিন্তু আপনর মৃত্যুর পর আপনি থাকবেন নবী আলাইহিস সালামগণের জামায়াতে আর আমরা থাকবো বহু দূরে। তখন আপনার জিয়ারত আমাদের নছীব হবে না।” হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চুপ করে রইলেন। তখন এ আয়াত শরীফ নাযিল হলো-

ومن يطع الله والرسول فاولئك مع الذين انعم اللهعليهم من النبين وصديقين والشهداء والصلحين.

অর্থ:- “যে আল্লাহ তায়ালা ও তদীয় রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পরিপূর্ণ অনুসরণ করবে, সে সেইসব লোকদের সঙ্গে থাকবে, যাঁদের উপর আল্লাহ পাক উনার নিয়ামত থাকবে এবং উনারাই হলেন- নবী, ছিদ্দক্বী, শহীদ এবং নেককারগণ।” (সূরা নিসা-৬৯)

আয় আল্লাহ পাক! আপনি আমাদের সকলকে হুববে রসূল ও দীদারে রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নসীব করুন। (আমীন)

(হাকেম, তিররানী, দারু কুতনী, আবু নঈম, ইবনুহিব্বান, খুজাইমা, খাছায়েছুল কুবরা, সীরাতুন নবী সাইয়্যিদুল মুরসালীন, দুররুল মুখতার ইত্যাদি।

(Visited 9 times, 1 visits today)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *