রিফান আহমেদ : রাজধানীসহ সারাদেশে মাদক পাচার, সেবন ও মজুতের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অভিযান অব্যাহত। গত মে মাসে মাদকের বিরুদ্ধে রীতিমত যুদ্ধ ঘোষণা করে প্রশাসন। সরকারের নির্দেশে কঠিন শাস্তির বিধান রেখে পাশ করা হয় মাদকবিরোধী আইন। তবুও থামানো যাচ্ছে না এর ভয়াবহ আগ্রাসন। সড়ক, রেল ও বিমান সবপথেই ঢুকছে মাদক, আর পৌঁছে যাচ্ছে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায়। প্রশাসন যেমন তৎপর, তেমনি নিশ্চুপ নেই মাদক ব্যবসায়ীরাও। ব্যবসা নির্বিঘœ করতে তারা পরিবর্তন করেছে রুট। শুধু ‘রুট’ নয়, মাদক বহনকারী মাধ্যম থেকে শুরু করে পরিবর্তন এনেছে মাদকের রংয়েও। শুধু লালচে বা গোলাপী রংয়েই নয়, স¤প্রতি রাজধানীর রামপুরায় গন্ধহীন ধবধবে সাদা রংয়ের ৮০পিস ইয়াবাসহ এক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।
মাদক নির্মূলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের নেতৃত্বে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড, র‌্যাব-পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। মূল কার্যক্রমের মধ্যে এক নম্বরে ছিল সীমান্ত পথে মাদকদ্রব্যের অবৈধ প্রবেশ বা পাচার বন্ধ করা। আর দুই নম্বরে মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করা। রুটিনমাফিক প্রশাসনের মাদকবিরোধী এ অভিযানে প্রতিদিনই গ্রেফতার হচ্ছে শত শত মাদকসেবী ও মাদক বিক্রেতা। অভিযানে মৃত্যুও হয়েছে মাদকের অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পরিবহনে যুক্ত চোরকারবারীর। সূত্রমতে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকায় থাকা ৬১ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে সাবরাং ইউনিয়নের আলীরডেইল গ্রামের বাসিন্দা আকতার কামাল নিহত হন এবং নয়াপাড়ার শামসুল আলম মার্কিনের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার হয় কক্সবাজার থেকে। তবে চলমান অভিযানে গ্রেফতার এড়াতে অপর চিহ্নিত ও শীর্ষ বিক্রেতারা রয়েছে আত্মগোপনে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নানা কৌশলে মাদক পাচারের চেষ্টা করছে তারা। তাই মাদক উদ্ধার হলেও থামছে না অবাধ বিক্রি ও সেবন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকায় রাজধানী ঢাকায় শীর্ষস্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৩৭। তাঁদের মধ্যে মো. নাদিম ওরফে পচিশ ও মো. নজরুল ইসলাম ওরফে নজু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। অন্যরা রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও, মিরপুর-২, ভাষানটেকের মতো চিহ্নিত মাদকের স্পটগুলো ভেঙ্গে দেওয়ার পরেও সর্বত্রই দেখা মিলছে ভ্রাম্যমান মাদক কেনা-বেচা।
রাজধানীর বিভিন্ন মাদক স্পটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কারওয়ান বাজার রেললাইন বস্তিতে ভাসমান মাদক বিক্রেতাদের আনা-গোনা রয়েছে এখনও আগের মতো। এই বস্তির একটি অংশ ভেঙে দেওয়া হলেও বন্ধ হয়নি মাদক বেচা-কেনা। তেজগাঁওয়ের দক্ষিণ বেগুনবাড়ি এলাকায় রেললাইনের পাশে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে গাঁজা। মিরপুর-২ এর রাইনখোলা ঝিলপাড় বস্তিতে ভ্রাম্যমান মাদক ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যে বিক্রি করছে মাদক। গত ২১ সেপ্টেম্বর এই বস্তিতে ইয়াবা কিনতে গিয়ে খুন হন পরিবহন শ্রমিক জাকির হোসেন (৩৫)। ভ্রাম্যমান মাদক বিক্রেতা বুলেট ছুরিকাঘাত করে জাকিরকে। ঘটনায় জড়িত রুবেল ও লিটনকে ঐ রাতেই এবং ৩ অক্টোবর বুলেটকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এদিকে ভাসানটেক এলাকায় মাদকের স্পট না থাকলেও একাধিক ভ্রাম্যমাণ মাদক বিক্রেতা রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট সংলগ্ন এক নম্বর বস্তির (কুমিল্লাপট্টি) স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, আলোচিত মাদক চোরাকারবারিরা রয়েছে আত্মগোপনে। তবে এলাকায় মাদক কেনাবেচা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে কতিপয় নব্য ব্যবসায়ী। তারা সহযোগীদের মাধ্যমে গোপনে মাদক সরবরাহ ও বিক্রি করছে। জেনেভা ক্যাম্পে উপর্যুপরি অভিযানের পর মাদক ব্যবসা কিছুদিন থেমে ছিল। নতুন করে আবারও একটি চক্রের সক্রিয় হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে প্রশাসনের কঠোর তদারকিতে মাদক পাচারের রুট পরিবর্তনেও বাধ্য হয়েছে ব্যবসায়ীরা। তাই ‘টেকনাফ বা কক্সবাজার’ রুট পরিবর্তিত হয়ে এখন দেশের সকল সীমানা দিয়ে মাদক প্রবেশ করছে এবং অভিনব পন্থায়। পরিবর্তন আনা হয়েছে মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত বাহকও। আগে শিশু ও নারীদের ব্যবহার করা হলেও এখন বাসচালক, অ্যাম্বুলেন্সচালক, কুরিয়ার সার্ভিস, ডিনার সেটের কার্টনসহ বিভিন্ন পন্থায় আনা হচ্ছে মাদক। কখনও কখনও চালান ধরা পড়লেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। গত এক বছরে চট্টগ্রাম, ফেনী, কক্সবাজার, ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশালে অন্তত অর্ধশত কুরিয়ার সার্ভিস থেকে ইয়াবা চালান আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এসব ঘটনায় প্রাপক গ্রেফতার হলেও প্রেরক সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। প্রেরকদের ঠিকানাগুলো সবসময় থাকে ভুয়া। এমনকি মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে খুঁজেও মিলে না কারও সন্ধান।
গত ২৭ আগস্ট মতিঝিলের সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস থেকে ইয়াবার চালানসহ ধরা পড়ে চার মাদক ব্যবসায়ী। প্যারাশুট ও ভাটিকা প্রসাধনীর কৌটায় করে ইয়াবা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। ঐ চালান রিসিভ করতে গেলে র‌্যাব তাদের গ্রেফতার করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে, কুরিয়ারের কর্মী বা তাদের এজেন্টরাই মাদক পাচারে জড়িত।
এ বিষয়ে সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের এমডি দেলোয়ার হোসেন জানান, ‘আমরা সবসময় সতর্ক থাকি। তারপরও মাদক চোরাকারবারিরা এমনভাবে কাজ করে, যা সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকে। টেলিভিশন, ল্যাপটপসহ নানাবিধ পণ্যের আড়ালে এসব মাদকের চালান পাঠিয়ে থাকে। সবসময় এসব পণ্য আমাদের এজেন্টরা খুলে দেখতে পারে না। কেউ এগুলো সন্দেহও করে না। তবে প্রতিষ্ঠানের কোনও এজেন্ট বা কর্মীর সম্পৃক্ততা পেলে দ্রæতই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমরা মাদকের বিষয়ে কোনও ছাড় দেবো না।
র‌্যাব-১০ এর কমান্ডিং অফিসার (সিও) এডিশনাল ডিআইজি কাইয়ুমুজ্জামান বলেন, ‘কুরিয়ার সার্ভিসকে মাদকপাচারের একটা সুবিধাজনক রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে চোরাকারবারিরা। তবে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি কুরিয়ার সার্ভিসের সংশ্লিষ্টরা আন্তরিক হলে কুরিয়ারে মাদকপাচার বন্ধ করা সম্ভব।’
এদিকে মাদক নির্মূলে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন জিরো টলারেন্সে, তখনই মাদকসহ গ্রেফতার হয়েছে খোদ প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তা। মাদক পাচারে তাদের সংশ্লিষ্টতারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমন একটি চক্রকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন বিভাগের কর্মকর্তা মোল্যা নজরুল ইসলাম। তিনি জানান, গত মার্চে মুঠোফোনে আড়ি পেতে মুন্সিগঞ্জের শীর্ষস্থানীয় মাদক বিক্রেতা আরিফের সঙ্গে কিছু পুলিশ সদস্যের কথোপকথন জানতে পারে সিআইডি। এরই সূত্র ধরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও রাজবাড়ীর চার পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। শুধু পুলিশের নিচের দিকের সদস্যরাই নন, পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ আছে পুলিশের ওপরের দিকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও। গত জুনে রামুতে অভিযান চালিয়ে ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় চট্টগ্রাম রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মনির-উজ-জামান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লিয়াকত আলীকে তিরস্কার করেন এবং আসামির নাম অভিযোগপত্র থেকে বাদ দিতে চাপ সৃষ্টি করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে মনির-উজ-জামানকে বদলি করা হয়। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, গত এক বছরে মাদক কেনাবেচায় যুক্ত থাকার অভিযোগে শতাধিক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের কর্মকর্তা খোরশিদ আলম বলেন, জোরেশোরে যখন অভিযান চলে তখন ইয়াবার দাম বাড়ে। রাজধানী ঢাকায় চম্পা (ছোট ইয়াবা) সর্বনিম্ন ১০০ টাকায় ও আর সেভেন (বড় ইয়াবা) ২০০ টাকায় বিক্রি হতো। এখন ছোটটা ১৫০ থেকে ২০০ টাকা এবং বড়টা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় পৌঁছেছে। তবে প্রকাশ্যে বেচাকেনা ও সেবন আগের থেকে কমেছে। তবে উদ্বিগ্নের বিষয়, এখন নতুন নতুন বিক্রেতা দেখা যাচ্ছে, হাত বদল হচ্ছে ব্যবসার।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ‘গত ৬ মাসে মাদকবিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত ৯ হাজার ৪৫৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৮৩ জন মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে ৩৫০ কোটি ৬০ লাখ টাকার।’
পুলিশ সদর দফতরের এআইডি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্সে। অভিযান চলছে। এটি একটি চলমান ও সমন্বিত প্রক্রিয়া। মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। নিয়মিত মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা আপডেট করা হচ্ছে। হানা দিয়ে তছনছ করা হচ্ছে তাদের আস্তানা। সবার সহযোগিতায় মাদক নির্মূল করা হবে। মাদকের সঙ্গে জড়িত কেউ রক্ষা পাবে না।’
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ৪ মে থেকে ১৭ অক্টেবর পর্যন্ত র‌্যাবের ৩ হাজার ৯০৮টি অভিযানে ৬ হাজার ৬৮৪ জন মাদক বিক্রেতা ও মাদকসেবীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৮৩ জন মাদক চোরাকারবারি নিহত হয়। এসব অভিযানে ৫৬ লাখ ৬৮ হাজার ১০০ পিস ইয়াবা, ২ হাজার ৩৯১ কেজি গাঁজা, ৫৩ হাজার ৬৫২ বোতল ফেনসিডিল, ১৫ কেজি ৮৫৭ গ্রাম হেরোইন, ৩০ হাজার ৩৮৬ বোতল বিদেশি মদ ও ১২ লাখ ৮৯ হাজার ৬৭৪ লিটার দেশি মদ উদ্ধার করা হয়।

(Visited 2 times, 1 visits today)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *